
Howrah News: সকলেরই ধারণা বডি বিল্ডিং প্রফেশনাল স্তরে করতে গেলে অনেক টাকা খরচ। কিন্তু সকলের সেই সাধ্য থাকে না। কিন্তু ঘরের খাওয়ার খেয়েও তা সম্ভব, প্রমাণ করলেন হাওড়ার ছেলে।
হাওড়া, রাকেশ মাইতি : সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছে বডি বিল্ডিং বা শরীরচর্চা মানেই এক অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিষয়। প্রোটিন সাপ্লিমেন্ট, দামি ডায়েট আর আধুনিক জিমের বিপুল খরচের ভয়ে অনেকেই এই স্বপ্ন দেখার সাহস পান না। কিন্তু সেই চেনা ধারণা ভেঙে এক নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন হাওড়ার এক তরুণ। নিয়মিত অনুশীলন, সঠিক প্রশিক্ষণ এবং ঘরের সাধারণ খাবার খেয়েও যে এই খেলায় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন ডোমজুড়ের লক্ষণপুরের বাসিন্দা অভিরণ নস্কর।
অভিরণ হাওড়ার ডোমজুড় ব্লকের লক্ষণপুরের এক অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা সুভাষ নস্কর পেশায় একজন সাধারণ মানুষ। মাত্র দু’বছর আগে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি উদ্দেশ্যে শরীরচর্চার জগতে পা রেখেছিলেন অভিরণ। তখন তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণ করা। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই তিনি স্থানীয় একটি জিমে ভর্তি হন। তবে শুরুতে কোনও দামি সাপ্লিমেন্ট বা ব্যয়বহুল বিদেশি খাবার নয়, বরং বাড়ির তৈরি সাধারণ খাবার খেয়েই নিজের অনুশীলন শুরু করেন তিনি।
প্রথম দিকে বডি বিল্ডিংয়ের কোনও পরিকল্পনা না থাকায় খাবারের পেছনে অতিরিক্ত তেমন কোনও ব্যয় করতে হয়নি অভিরণকে। তাঁর পরিবার জানায়, শুরুতে খাবারের জন্য প্রতিদিন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হতো। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে জিমের লোহার সঙ্গে এক অদ্ভুত মিতালি তৈরি হয়ে যায় অভিরণের। শরীরচর্চার প্রতি ভালোবাসা এতটাই বেড়ে যায় যে, তিনি পেশাদার বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। আর এই সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
প্রতিযোগিতার মঞ্চে নামার আগে শরীর গঠনের জন্য খাদ্যতালিকায় কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছিল অভিরণকে। এই সময় তাঁর ডায়েটে মাছ, মাংস ও ডিমের পরিমাণ বাড়াতে হয়। স্বভাবতই খরচ কিছুটা বেড়ে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। কিন্তু পরিবারের সীমিত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অভিরণের বাবা ছেলের এই স্বপ্নপূরণের পথে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়াননি। সাধ্যমতো জোগান দিয়েছেন প্রয়োজনীয় পুষ্টির। অল্প সময়ের মধ্যেই অভিরণ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজের প্রতিভার আলো ছড়াতে শুরু করেছেন।
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে অভিরণ বলেন, “মাধ্যমিকের পর শুধু ওজন কমানোর জন্যই জিমে গিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে বডি বিল্ডিং ভালোবেসে ফেলি। খুব সাধারণ খাবার খেয়েই আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রতিযোগিতার আগে খরচ একটু বাড়লেও কখনও অর্থের অভাবকে মনের ওপর চড়াও হতে দিইনি। ভবিষ্যতে আরও বড় মঞ্চে বাংলার হয়ে মেডেল জেতাই এখন আমার একমাত্র লক্ষ্য।” ছেলের এই লড়াইয়ে গর্বিত বাবা সুভাষ নস্করও জানান, ছেলের কঠোর পরিশ্রম ও জেদ দেখে আজ তাঁদের বুক গর্বে ভরে উঠছে।
অভিরণের এই অভাবনীয় পথচলা বর্তমানে সমাজের বহু সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের কাছে এক মস্ত বড় অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য পকেটে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয় না, বরং প্রয়োজন এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর শৃঙ্খলা এবং নিরলস পরিশ্রমের। প্রতিদিনের ঘাম ঝরানো অনুশীলন আর পারিবারিক সমর্থনকে সঙ্গী করে অভিরণ যেভাবে এগিয়ে চলেছেন, তা আগামী দিনে বহু তরুণকে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই বডি বিল্ডিংয়ে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার সাহস জোগাবে।
