স্পেনের শেষ মুহূর্তের গোলে পর্তুগাল পরাস্ত, অশ্রুসজল চোখে বিদায় নিষ্প্রভ রোনাল্ডোর

স্পেনের শেষ মুহূর্তের গোলে পর্তুগাল পরাস্ত, অশ্রুসজল চোখে বিদায় নিষ্প্রভ রোনাল্ডোর

 

Football

-Ritesh Ghosh

একটি যুগের অবসান ঘটল। ফুটবল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে গেল স্পেনের কাছে পর্তুগালের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে মাইকেল মেরিনোর অনবদ্য গোলটি স্পেনের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া নিশ্চিত করেছে। কিন্তু এই হারের সঙ্গেই ৪১ বছর বয়সী রোনাল্ডোর আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চের বর্ণিল সফরের এক বিষাদময় সমাপ্তি ঘটল।

ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে যখন টাইব্রেকারের ঠিক আগের শ্বাসরুদ্ধকর সময় গোনা শুরু হয়েছিল, তখনই ফেররান তোরেসের বাড়ানো পাস থেকে বল পেয়ে স্প্যানিশ মিডফিল্ডার মাইকেল মেরিনো অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পর্তুগিজ গোলরক্ষক দিওগো কোস্তাকে পরাস্ত করেন। গোল করার পর কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে ছুটে গিয়ে মেরিনোর উদযাপন গ্যালারিতে আলাদা এক উন্মাদনা তৈরি করে। ১৯৯১ সালে স্টুটগার্টের বিরুদ্ধে ওসাসুনার হয়ে গোল করে তাঁর বাবা ঠিক যেভাবে মেতেছিলেন, মেরিনো যেন মাঠের সেই কোণায় সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন।

Cristiano Ronaldo heartbroken after Portugal s World Cup exit

পর্তুগিজ শিবিরের চিত্রটি ছিল পুরো ভিন্ন এবং চরম হতাশাজনক। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পর মাঠের মাঝখানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা রোনাল্ডোর মলিন অবয়ব এক অমোঘ সত্য ফুটিয়ে তুলছিল। ইতিহাস সৃষ্টিকারী একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী রোনাল্ডোকে আর কখনও এই টুর্নামেন্টে লড়তে দেখা যাবে না। কাতার বিশ্বকাপে প্রথম একাদশ থেকে বাদ পড়ার দিন থেকেই বিদায়ের যে ঘণ্টাধ্বনি বেজেছিল, তা আজ চূড়ান্ত রূপ পেল।

পর্তুগাল দলে রোনাল্ডোর অতিমানবীয় উপস্থিতি ইদানীং আশীর্বাদের চেয়ে এক অদৃশ্য বোঝার মতো রূপ ধারণ করছে। দলের তরুণ ও প্রতিভাবান মধ্যমাঠকে সাহায্য করার পরিবর্তে তাঁর একার তারকাখ্যাতিই যেন সমস্ত সতীর্থদের স্বাভাবিক খেলাকে আড়াল করে দিচ্ছিল। এই ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত নিষ্প্রাণ। গতি হারিয়ে ফেলায় আক্রমণভাগে তিনি বারবার খেই হারিয়েছেন, যার খেসারত দিতে হয়েছে পুরো পর্তুগাল দলকে। মাঠের দুর্দান্ত উইঙ্গারদের বল জোগান দেওয়ার বদলে রোনাল্ডো নিজেই বল পাওয়ার জন্য জেদ দেখিয়েছেন।

মাঠে বল পাওয়ার জন্য রোনাল্ডোর অনড় ভঙ্গি সতীর্থদের তীব্র মানসিক চাপে ফেলে দিচ্ছিল। অপ্রয়োজনীয় ড্রিবলিং আর রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁর অতি-নাটকীয় অসন্তোষ প্রকাশ যেন তাঁর সোনালী সময়ের বিদায়ঘণ্টার করুণ সুরকেই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল। নিজের চিরপরিচিত গতিহীন শরীরেও রোনাল্ডো যেভাবে প্রতিটি বিল্ড-আপের কেন্দ্রে থাকতে চেয়েছেন, তা দলের রণকৌশলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। ম্যাচের সবচেয়ে কঠিন সময়ে দলের তরুণদের ওপর চিৎকার করার ভঙ্গি তাঁর ব্যক্তিগত অহমেরই বহিঃপ্রকাশ ছিল।

ম্যাচের আগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে রোনাল্ডোর বক্তব্য ছিল স্ববিরোধী ও আবেগঘন। সেখানে ছিল যেমন কৌতুক ও খোঁচা, তেমনই ছিল অবসরের পথে পা বাড়ানো এক অ্যাথলিটের কান্না চেপে রাখার করুণ আকুতি। এর পাশাপাশি গ্যালারিতে রোনাল্ডোর অন্ধ ভক্তদের উগ্র আচরণ এবং উইঙ্গার ইয়ামালকে লক্ষ্য করে তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত দুয়োধ্বনি দেওয়ার মতো ঘটনা ফুটবলীয় স্পিরিটকে কিছুটা বিষাদগ্রস্ত করেছে। রেফারির কাছে বারবার রোনাল্ডোর অসহায় আবেদন এবং ভক্তদের সেই একপেশে সমর্থন যেন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছিল।

ক্রীড়া বিশ্লেষকেরা এই প্রসঙ্গে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসির নাম নিয়ে আসছেন, যা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। মেসি নিজের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খেলার ধরনে চমকপ্রদ রূপান্তর ঘটিয়েছেন। মাঠে অতিরিক্ত না দৌড়ে বুদ্ধিদীপ্ত পাসের মাধ্যমে খেলা নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং নতুনদের জায়গা তৈরি করে দিচ্ছেন। কিন্তু রোনাল্ডো এখনও স্ট্রাইকার পজিশনে অনড় থেকে সেই পুরোনো ধার ফিরে পাওয়ার নিষ্ফল চেষ্টা করেছেন, যা আধুনিক ফুটবলের উচ্চ-গতির খেলায় পর্তুগালের প্রতিভাবান ফুটবলারদের স্বাভাবিক বিকাশকে অবরুদ্ধ করেছে।

রোনাল্ডোর ট্র্যাজেডি বাদ দিলে, দীর্ঘ নব্বই মিনিটের ম্যাচটি ছিল দুই ইউরোপীয় শক্তির মধ্যমাঠের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। স্পেনের মাঝমাঠের মূল ভরসা রদ্রি তাঁর দীর্ঘদিনের লিগামেন্টের চোট পেরিয়ে ধীরে ধীরে নিজের সেরা ফর্মে ফিরছেন। পুরো খেলায় তাঁর শান্ত ও পরিপক্ব নিয়ন্ত্রণ স্পেনকে মানসিক সুবিধা এনে দিয়েছিল। অন্যদিকে, পর্তুগাল রক্ষণভাগের নুনো মেন্দিস অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলেছেন। প্রথমার্ধে স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামালকে তিনি ডান প্রান্তে সম্পূর্ণ বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন।

মেন্দিস কেবল রক্ষণভাগেই রুখে দাঁড়াননি, প্রথমার্ধের ঠিক আগে তাঁর একটি দুর্দান্ত দূরপাল্লার শট স্পেনের গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসে। কিন্তু ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শেষের দিকে ইয়ামালকে আটকাতে গিয়ে তিনি গুরুতর চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। ফরাসি ক্লাব পিএসজির এই ডিফেন্ডারের অনুপস্থিতিতে বার্সেলোনার তরুণ ফরোয়ার্ড ইয়ামাল ম্যাচে নিজের আক্রমণাত্মক রূপ মেলে ধরেন। স্পেন এরপর থেকে মুহুর্মুহু আক্রমণে পর্তুগালের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দেয়।

তবে এবারের টুর্নামেন্টে পূর্বের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের মতো ক্ষুরধার দেখা যাচ্ছে না স্প্যানিশ শিবিরকে। নিকো উইলিয়ামসের অপ্রতিরোধ্য গতি এবং বাঁ-প্রান্ত থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণের অভাব নিশ্চিতভাবেই টের পাচ্ছে স্পেন। তবুও শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিয়ে টুর্নামেন্টে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। এই জয়ের ধারা নিয়ে আগামী শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসে স্পেন মুখোমুখি হবে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে, যা তাদের পরবর্তী বড় পরীক্ষা হতে চলেছে।

(Feed Source: oneindia.com)