Kolkata
-Ritesh Ghosh
বারুইপুরের নাবালিকার নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতায় কালীঘাট তৃণমূলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের একটি বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল কালীঘাট এলাকা। বুধবার আয়োজিত এই মিছিলে চরম বিশৃঙ্খলা ও হাতাহাতির মধ্যে এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, নিজের কর্মীদের রক্তাক্ত অবস্থা দেখে ক্ষুব্ধ মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি রাস্তায় নেমে আসেন।
এই চরম রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক ও চর্চা শুরু হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কালীঘাটের অশান্ত পরিস্থিতির মধ্যে মেজাজ হারিয়ে ফেলেন মুখ্যমন্ত্রী। নিজের কর্মীদের ঝামেলার থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি এক ব্যক্তিকে সপাটে থাপ্পড় মেরে বসেন। জানা গিয়েছে, আক্রান্ত ওই ব্যক্তি আদতে শাসকদলেরই এক সক্রিয় কর্মী।

ডিভিওটি ভাইরাল হতেই তৃণমূল শিবিরের পক্ষ থেকে দ্রুত সাফাই দেওয়া শুরু হয়। দলের একাংশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মিছিলে আকস্মিক বিশৃঙ্খলার জেরে বেশ কয়েকজন কর্মী অসুস্থ ও জ্ঞানহীন হয়ে পড়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়ে তাঁদের গাড়িতে তুলে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিলেন। সেই সময় অতিরিক্ত ভিড় সামলাতে এবং অসুস্থদের পথ করে দিতে গিয়ে হাত দিয়ে সবাইকে সরতে বলছিলেন তিনি।
সেই তুমুল হট্টগোলের মধ্যেই অসাবধানতাবশত ওই কর্মীর গায়ে বা গালে হাত লেগে যায়, যা ভিডিওতে থাপ্পড় মারার মতো দেখাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও কর্মীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আরও বেশ কয়েকজন কর্মীর পিঠে মৃদু চড়-চাপ্পড় মারতেও দেখা গিয়েছে।
মিছিল ঘিরে ধুন্ধুমার ও তৃণমূলের অভিযোগ
বারুইপুরের ঘটনার প্রতিবাদে কলকাতা হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে তৃণমূল ছাত্র ও যুব সংগঠন কালীঘাট সংলগ্ন এলাকায় একটি ধিক্কার মিছিলের আয়োজন করেছিল। কিন্তু মিছিল শুরু হতেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। তৃণমূলের অভিযোগ, আদালতের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও বিজেপির একদল বহিরাগত মিছিলে ঢুকে পরিকল্পিতভাবে অশান্তি ছড়ায়।
উভয় পক্ষের মধ্যে স্লোগান ও পাল্টা স্লোগান দেওয়া শুরু হতেই পরিস্থিতি দ্রুত হিংসাত্মক রূপ নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়। এই হামলায় তৃণমূলের মহিলা ও পুরুষ কর্মীদের ওপর ব্যাপক মারধর চালানো হয়েছে বলে কালীঘাট তৃণমূলের দাবি। অশান্তির খবর পেয়েই পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে নিজের বাড়ি থেকে সরাসরি রাস্তায় বেরিয়ে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত কর্মীদের দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি অভিযোগ করেন, বাইরে থেকে লুম্পেন এনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া মেয়েদের ওপর হামলা করা হয়েছে। রক্তাক্ত কর্মীদের দেখিয়ে তিনি বলেন, “আমি ঝামেলার কথা শুনে ছুটে এসেছি। এসে দেখি আমার কর্মীদের মাথা ও মুখ ফেটে রক্ত ঝরছে। মেয়েদের গায়ে যেভাবে হাত দেওয়া হয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না।”
এই গোলমালের পেছনে পুলিশ এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন মমতী। তাঁর বক্তব্য, যেখানে হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ মেনে শান্তিপূর্ণ মিছিল করার কথা, সেখানে পুলিশ কেন আগে থেকে ব্যবস্থা নেয়নি? একই পুজো কার্নিভাল বা মিছিলের রুটে কীভাবে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের জমায়েতের অনুমতি দেওয়া হল, তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
বিজেপি সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন, “এই পরিবর্তনের কথাই কি বাংলার মানুষ চেয়েছিল? ক্ষমতা কীভাবে হাতানো হয়েছে তা সবার জানা। কিন্তু দয়া করে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখুন।” মিছিলে বাধা দেওয়া এবং হ্যান্ডমাইক কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে তিনি ফের আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বিজেপির পাল্টা তোপ ও সজল ঘোষের কটাক্ষ
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই ক্ষোভ এবং দলীয় কর্মীকে থাপ্পড় মারার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টা আক্রমণ শানাতে ছাড়েনি শাসক শিবির। বিজেপির বিধায়ক সজল ঘোষ এই আচরণকে তীব্র কটাক্ষ করে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “তিনি প্রকাশ্য রাস্তায় মেজাজ হারিয়ে যেভাবে নিজের দলের কর্মীদের মারধর করছেন, তাতেই স্পষ্ট ওঁর মানসিক স্থিতি ঠিক নেই।”
তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলা চালানোর অভিযোগ সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছেন সজল ঘোষ। তাঁর দাবি, অতীতে যখন সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারী বা দিলীপ ঘোষের মতো শীর্ষ বিজেপি নেতাদের পাড়ায় পাড়ায় কালো পতাকা দেখানো হতো, গো-ব্যাক স্লোগান দেওয়া হতো, তখন কি আদালতের অবমাননা হতো না? আজকের ঘটনা স্রেফ সাধারণ মানুষের বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।
বিজেপি বিধায়ক আরও যোগ করেন, “আজকের এই মারামারির ঘটনার সঙ্গে আমাদের দল যুক্ত নয়। তবে বাংলার সাধারণ মানুষ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় বা জনরোষ দেখায়, তবে তাকে পুলিশ দিয়ে আটকানো যাবে না।”
(Feed Source: oneindia.com)
