India
-Ritesh Ghosh
ভারতীয় রেলের দূরপাল্লার ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা এসি কোচে যাতায়াতকারী যাত্রীদের নাগরিক সচেতনতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। টিকিট কেটে এসি কোচে সফরের পাশাপাশি যে বিছানার চাদর, তোয়ালে এবং কম্বল ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়, তা অনেকেই নিজের সম্পত্তি মনে করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি সামনে আসা এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে দেখা গিয়েছে, হাজার হাজার এসি যাত্রী যাত্রা শেষে রেলের বেডরোলের বিভিন্ন সামগ্রী লুকিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছেন।
তথ্য জানার অধিকার (RTI) আইনের সাহায্যে দেশের বিভিন্ন রেলওয়ে ডিভিশন থেকে সংগৃহীত তথ্যে এক অদ্ভুত মানসিকতার ছবি প্রকাশ পেয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে কোভিডের পর রেলে যখন চাদর-কম্বল দেওয়ার বন্দোবস্ত নতুন করে চালু হয়, তখন থেকেই ট্রেনের জিনিস গায়েব হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। তথ্য বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে রেলের অন্তত ১ কোটি ২৭ লাখ বিছানাপত্র ও তোয়ালে চুরি হয়ে গিয়েছে।

পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, প্রতি রাতে ভারতীয় রেল জুড়ে প্রায় ৮ লাখ যাত্রী এসি কামরায় যাত্রা করেন। আর তাঁদের মধ্যে প্রতি হাজার জনের মধ্যে অন্তত একজন যাত্রী এই চুরির কাজের সঙ্গে যুক্ত। ২০২২ সালের পর থেকে ২০২৫ সালের বার্ষিক হিসাবে এই ধরনের চুরির ঘটনা রেকর্ড হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫৬ শতাংশের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বিশাল রেল পরিষেবার তুলনায় এটি অতি সামান্য মনে হলেও, এর আর্থিক বোঝা কিন্তু যৎসামান্য নয়।
চুরির তালিকায় শীর্ষে কোন কোন জিনিস?
চুরি যাওয়া সামগ্রীগুলির তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে জিনিসটি সবচেয়ে সহজে এবং অতি সন্তর্পণে ব্যাগে চালান করা যায়, সেটির প্রতিই যাত্রীদের নজর বেশি। আর সেই কারণে তালিকার প্রথম স্থানে রয়েছে মুখ মোছার ছোটো তোয়ালে বা ফেস টাওয়েল। বিগত চার বছরে ৪৬.৫৪ লাখেরও বেশি ফেস টাওয়েল চুরি গিয়েছে ট্রেন থেকে। এর ঠিক পরেই রয়েছে সাদা বিছানার চাদর বা বেডশিট, যা প্রায় ৪১.১৩ লাখ উধাও হয়েছে।
যাত্রীদের এই বিস্ময়কর অভ্যাস থেকে বাদ যায়নি অন্যান্য সামগ্রীও। ট্রেনে সুন্দর করে পেতে রাখা চাদরের পাশাপাশি প্রায় ২৩.৫৯ লাখ বালিশের কভার, ১২.৯৫ লাখ রেলের ভারী কম্বল এবং ২.৭৬ লাখ নরম বালিশ যাত্রীরা নিজের মনে করে বাড়ি নিয়ে চলে গিয়েছেন। দেশের একাধিক রেলওয়ে ডিভিশন থেকে এই বিপুল পরিমাণ বিছানাপত্র খোয়া যাওয়ার কারণে রেলের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণে এক বিরাট সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে, দেশের সব জোনে এই চুরির প্রবণতা একরকম নয়। দেশের মোট ১৭টি জোনের ১০টি বাছাই করা ডিভিশন থেকেই মোট চুরির শতকরা প্রায় ৬৭ ভাগ ঘটনা ঘটছে। রাজস্থানের বিকানের ডিভিশন চুরির তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করেছে। এখান থেকেই উধাও হয়েছে ২৫.৭৬ লাখ রেলের সামগ্রী, যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল বিছানার চাদর। এছাড়া রাঁচি থেকে ৯.৩১ লাখ এবং দিল্লি থেকে ৮.২১ লাখ সামগ্রী চুরির ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তবে এর বিপরীতে কিছু অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় উদাহরণও কিন্তু সামনে এসেছে। ভারতীয় রেলের দক্ষিণ প্রান্তের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশন— তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লী এবং কেরলের পালঘাট থেকে একটিও বেডরোল সামগ্রী খোয়া যাওয়ার রিপোর্ট আরটিআই-তে আসেনি। অন্যদিকে, রেল কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারির দরুন রাজধানী দিল্লিতে আবার এই চুরির দাপট এক ধাক্কায় প্রায় ৭৯ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে।
কারা গুনছেন এই ক্ষতির মাশুল?
তদন্তে দেখা গিয়েছে, এই চুরির সরাসরি প্রভাব কিন্তু ট্রেন কর্মীদের জীবিকার ওপর পড়ছে। আরটিআই ডেটা বিশ্লেষণ করে আনুমানিক হিসাব মেলালে দেখা যাচ্ছে, বিগত চার বছরে বেডরোল সরবরাহকারী বেসরকারি ঠিকাদার সংস্থাগুলির প্রায় ১০৪.৫১ কোটি টাকার বিরাট অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। তবে কিছু কিছু ডিভিশন সম্পূর্ণ তথ্য না দেওয়ায় আসল আর্থিক ক্ষতির মাত্রা আরও অনেক বেশি বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
এই ঘাটতি মেটানোর অজুহাতে ঠিকা কোম্পানিগুলি সরাসরি ট্রেনের অস্থায়ী এবং দিনমজুর এসি কামরার অ্যাটেনডেন্টদের বেতন কেটে নিচ্ছে। কোচে দায়িত্বরত কর্মীরা দৈনিক মাত্র ৭০০ টাকা মতো মজুরি পান, যা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। অথচ প্রতি মাসে চুরির ক্ষতিপূরণ দিয়ে তাঁদের বেতন থেকে প্রায় ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। একটি জিনিস খোয়া গেলেও আর্থিক জরিমানা সইতে হয় তাঁদের।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, যাত্রীর চুরি করা একটি বালিশের জন্য রেলের অস্থায়ী কর্মীকে ১১৫ টাকা, চাদরের জন্য ১৯৮ টাকা এবং কম্বলের জন্য ৩৪৩ টাকা জরিমানা দিতে হয়। কম্বল বা চাদর পুরোনো হলে জরিমানার হার কিছুটা কমলেও কর্মীদের উপর চাপ কমে না। এর ফলে চরম সংকটে পড়তে হচ্ছে ওই শ্রমিকদের, যাঁরা আদতে যাত্রীদের আরামদায়ক এবং নিরাপদ সফরের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি খাটেন।
রেলের নয়া রণকৌশল ও কড়া নিষেধাজ্ঞা
এই বড় ধরনের চুরি রুখতে ভারতীয় রেল মন্ত্রক এখন বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। কোচের ভিতর ও স্টেশনে নজরদারি বাড়ানো, কোচে সিসিটিভি ক্যামেরা ট্র্যাকিং বৃদ্ধি করা এবং ‘কোচ মিত্র’ অ্যাপের সাহায্যে চাদর ও তোয়ালের বিলি-বণ্টন ডিজিটালি ট্র্যাক করা হচ্ছে। বিশেষ কিছু ডিভিশনে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যাতে নামার সময় যাত্রীদের জিনিসপত্র সঠিকভাবে যাচাই করে সংগ্রহ করা যায়।
রেল বোর্ডের নিয়মে বলা হয়েছে, যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছনোর ঠিক ত্রিশ মিনিট আগেই ব্যবহৃত চাদর ও কম্বল ফেরত দেবেন। ট্রেনে চুরি রুখতে সচেতনতামূলক প্রচারও চালানো হচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে।
(Feed Source: oneindia.com)
