
নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়তে তখনও বাকি। পশ্চিমবঙ্গে তখনও তৃণমূলের শাসন। ১৪ জানুয়ারি সন্ধেয় হঠাৎই রঞ্জিত মল্লিকের বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায়। খবর বোধহয় ছিল আগে থেকেই। অভিষেককে স্বাগত জানাতে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলেন রঞ্জিত ও তাঁর স্ত্রী দীপা মল্লিক।
গাড়ি থেকে নেমে সটান রঞ্জিতের দিকে এগিয়ে যান অভিষেক। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন। প্রণাম করেন দীপাকেও। হাসিমুখে অভিষেককে বুকে টেনে নিয়েছিলেন রঞ্জিত। কাঁধে হাত রেখে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর হাতে ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ তুলে দিয়েছিলেন অভিষেক। হাতে তুলে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি চিঠিও।

বেশ কিছু ক্ষণ পর যখন বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন, উভয়ের মুখেই হাসি। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে অভিষেকের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়েছিলেন রঞ্জিত। জানিয়েছিলেন, অভিষেককে ভাল লাগে তাঁর।

এর এক মাসের কিছু সময় পরই, ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজ্যসভার পদপ্রার্থী হিসেবে রঞ্জিত-কন্যা, অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের নাম ঘোষণা করে তৃণমূল। রাজ্যসভায় দলের অবস্থানকে তিনি আরও জোরাল করে তুলবেন বলে জানানো হয়। কোয়েলের বন্ধু তথা তৃণমূলের তদানীন্তন তারকা সাংসদ দেবও কোয়েলকে শুভেচ্ছা জানান সেই সময়। ফোনে কথা হয় দু’জনের।

সেই মতো ৫ জুন মনোনয়নপত্র জমা দেন কোয়েল। বাবুল সুপ্রিয়, মেনকা গুরুস্বামী এবং রাজীব কুমারও ওই দিনই, কোয়েলের সঙ্গে মনোনয়নপত্র জমা দেন। সেখানে তাঁদের পাশে দেখা গিয়েছিল অরূপ বিশ্বাসকেও। মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে বেরনোর সময় ভিকট্রি সাইন দেখিয়েছিলেন ক্যামেরাকে।

নির্ধারিত দিনে ১৬ মার্চ রাজ্যসভার নির্বাচন হলে, তাতে জয়ী হন কোয়েল। জয়ী হন বাবুল, মেনকা এবং রাজীবও। রাজনীতির কোনও শিক্ষা বা অভিজ্ঞতা না থাকলেও, মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েই রাজ্যসভায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সেই সময় জানিয়েছিলেন কোয়েল।

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে তখন তোলপাড় গোটা রাজ্য। অচলাবস্থা চলছে টলিপাড়াতেও। সেই পরিস্থিতিতেই ৬ এপ্রিল রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে দিল্লিতে শপথ নিতে যান কোয়েল। লালপাড় সাদা শাড়িতে বাংলায় শপথবাক্য পাঠ করেন তিনি। তবে কোয়েল নয়, নিজের আসল নাম রুক্মিণী মল্লিক হিসেবেই সাংসদ হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করেন।

সংসদীয় আইন অনুযায়ী, কোনও অধিবেশনে যোগ না দিয়ে, রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে মাত্র দু’মাস অতিবাহিত করলেও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য। তবে সেক্ষেত্রে আজীবন পেনশন মিলবে না। রাজ্যসভার সাংসদদের বেসিক মাসে ১ লক্ষ টাকা। সংসদীয় ক্ষেত্রের অ্যালাওয়্যান্স ৭০০০০ টাকা করে। দফতরের খরচ মেলে ৬০০০০ টাকা। মেলে যাতায়াত, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের খরচও। তবে সাংসদ হিসেবে পাঁচ বছর অতিবাহিত করলেই মাসে ন্যূনতম ৩১০০০ টাকা পেনশন মেলে। আড়াই মাসের সাংসদ কোয়েল তা পাবেন না।

এর পরই রাজনীতির নীতি মেনে দলের হয়ে প্রচারে নামেন কোয়েল। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের একাধিক প্রার্থীর হয়ে প্রচার করতে দেখা যায় তাঁকে। প্রচার করেছিলেন শ্রেয়া পান্ডের হয়েও। তৃণমূলের জয় নিয়ে তখনও আত্মবিশ্বাসী ছিলেন কোয়েল।

কিন্তু ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরোতেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ বছরের রাজপাট শেষ হচ্ছে তৃণমূলের। এর পরই কার্যত নিশ্চুপ হয়ে যান কোয়েল। তৃণমূলের কোনও মিটিংয়েও থাকেননি, রাজনীতির প্রাঙ্গনে কোথাও আর দেখা যায়নি তাঁকে।

ভোটে পরাজয়ের পর থেকে তৃণমূলের মুষলপর্বে কোয়েলের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও জল্পনা শুরু হয়। বাকিদের মতো তিনিও শিবির বদল করতে পারেন বা রাজ্যসভার আসনটি ছেড়ে দিতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছিল। তবে নিজেমুখে কিছুই বলেননি কোয়েল। বরং আত্মীয়ে বিয়ে উপলক্ষে বিদেশ চলে যান মা-বাবার সঙ্গে।

শেষ পর্যন্ত ১৬ জুন দিল্লিতে গিয়ে রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে পদত্যাগ করলেন কোয়েল। বৈঠক করলেন বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে, যে ভূপেন্দ্র তৃণমূলের বিদ্রোহী কূটকৌশল থেকে NCPI-তে শামিল হওয়া, সবেতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। তাহলে কি বাকিদের মতো কোয়েলও বিজেপি-তেই যাবেন? জল্পনা তুঙ্গে। বরাবরের মতো এখনও নীরবতাই পালন করছেন কোয়েল।

বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার চার দিন আগে রাজ্যসভার সাংসদ পদ ছাড়লেন কোয়েল। সবমিলিয়ে তাঁর সাংসদজীবন স্থায়ী হল মাত্র আড়াই মাস। একটি অধিবেশনেও দেখা যায়নি তাঁকে। কোয়েলের পদত্যাগের পর মমতা জানান, আগেই ইমেলে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন কোয়েল। কোয়েলকে নিয়ে একটিও বিরূপ মন্তব্য করেননি মমতা। বরং কোয়েলকে যে পছন্দ করেন, তা জানাতে ভোলেননি। তবে আর যাঁরা শিবির বদল করতে চান, ২১ জুলাইয়ের আগেই যেন করে ফেলেন, সেই বার্তাও দেন।
(Feed Source: abplive.com)
