Semicon 2.0 Explained: মোবাইল থেকে মিসাইল… সেমিকন্ডাক্টর চিপ শিল্পে কেন ১.২৭ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ভারত?

Semicon 2.0 Explained: মোবাইল থেকে মিসাইল… সেমিকন্ডাক্টর চিপ শিল্পে কেন ১.২৭ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে ভারত?

Semicon 2.0 আসলে কী? এতে এত টাকা কেন বিনিয়োগ করা হচ্ছে? সাধারণ মানুষের কী লাভ হবে? আর ভারত কি সত্যিই বিশ্বের বড় চিপ উৎপাদনকারী দেশ হয়ে উঠতে পারবে? সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।

ছোট্ট একটি চিপ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?দেখতে যতই ছোট হোক, চিপই যে কোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মস্তিষ্ক। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, গাড়ি, বিমান, চিকিৎসার যন্ত্র, 5G নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট এবং ক্ষেপণাস্ত্র—সব ক্ষেত্রেই চিপের প্রয়োজন হয়। তবে চিপ তৈরি করা বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন এবং ব্যয়বহুল কাজগুলির মধ্যে অন্যতম। এর জন্য প্রয়োজন কয়েকশো কোটি টাকার কারখানা, ধুলোমুক্ত ক্লিনরুম, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং বহু বছরের অভিজ্ঞতা। সেই কারণেই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক চিপ মূলত তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকার মতো কয়েকটি দেশেই তৈরি হয়।

Semicon 2.0 আসলে কী?সহজ করে বললে, ২০২১ সালে কেন্দ্র সরকার Semicon India Programme চালু করেছিল। সেই সময় প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ভারতে প্রথমবার চিপ তৈরির কারখানা এবং চিপ প্যাকেজিং ইউনিট গড়ে তোলা। Semicon 2.0 হল সেই প্রকল্পেরই আরও বড় এবং পরবর্তী ধাপ।

এবার সরকার শুধু চিপ তৈরির কারখানা গড়ে তুলেই থেমে থাকতে চায় না। লক্ষ্য হল, গোটা Semiconductor Value Chain ভারতে গড়ে তোলা। অর্থাৎ শুধু চিপ নয়, চিপ তৈরির যন্ত্র, সিলিকন ওয়েফার, ফটোরেজিস্ট, স্পেশালিটি গ্যাস, বিভিন্ন রাসায়নিক, গবেষণা, ডিজাইন এবং ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণ—সবকিছুই ভারতে তৈরি ও উন্নত করা হবে। এই প্রকল্প ছয় বছর চলবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

১.২৭ লক্ষ কোটি টাকা কোথায় খরচ হবে?সরকার এই প্রকল্পকে ছয়টি বড় ভাগে ভাগ করেছে।

  • প্রথম অংশ থাকবে Chip Design-এর জন্য। স্টার্টআপ এবং ভারতীয় সংস্থাগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে, যাতে তারা নিজেরাই চিপ ডিজাইন করতে পারে।
  • দ্বিতীয় অংশ বরাদ্দ থাকবে সেই সব সংস্থার জন্য, যারা চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত যন্ত্র, রাসায়নিক, স্পেশালিটি গ্যাস এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ভারতে তৈরি করবে।
  • তৃতীয় অংশ ব্যয় করা হবে নতুন Semiconductor Fab, অর্থাৎ চিপ তৈরির কারখানা গড়ে তোলার জন্য।
  • চতুর্থ অংশ খরচ হবে Packaging, Testing এবং Assembly Unit-এর সম্প্রসারণে।
  • পঞ্চম অংশ বরাদ্দ থাকবে নতুন প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য।
  • ষষ্ঠ অংশ ব্যয় করা হবে ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের কাজে।
সরকারের লাভ কী?সরকার এই প্রকল্পকে খরচ নয়, বরং বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে। সরকারের অনুমান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৪ লক্ষ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে। পাশাপাশি প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার চিপ উৎপাদন এবং প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার চিপ রপ্তানি সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ, ভারতের সম্পূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

এখনও পর্যন্ত কী কী হয়েছে?এমন নয় যে সব কাজ এখনও শুরু হবে। প্রথম পর্যায়েই সরকার ১২টি বড় প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যেই ১.৬৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ এসেছে। Micron, Kaynes এবং CG Semi-র প্যাকেজিং ইউনিটের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। গুজরাটের সানন্দে CG Semi-র ইউনিটের উদ্বোধনও হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হল গুজরাটের ধোলেরায় Tata Electronics-এর Silicon Fab। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে ভারতের প্রথম Made-in-India Silicon Chip এখান থেকেই তৈরি হবে। অন্যদিকে, দিল্লি-এনসিআরের কাছে জেওয়ার বিমানবন্দর এলাকায় HCL এবং Foxconn যৌথভাবে Display Driver Chip তৈরির ইউনিট গড়ে তুলছে।

Strategic Chip এবং Commercial Chip-এর মধ্যে পার্থক্য কী?সরকার মূলত দুই ধরনের চিপের উপর জোর দিচ্ছে। প্রথমটি হল Strategic Chip। এই চিপগুলি ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মহাকাশ কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয়। সরকার চায়, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চিপের জন্য ভারত যেন অন্য কোনও দেশের উপর নির্ভরশীল না থাকে।

দ্বিতীয়টি হল Commercial Chip। এই চিপগুলি স্মার্টফোন, গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, এসি, টেলিকম নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়।

ভারতে যখন মোবাইল তৈরি হচ্ছে, তাহলে চিপ তৈরির প্রয়োজন কেন?ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল উৎপাদন কেন্দ্র। দেশে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ স্মার্টফোনই ভারতে অ্যাসেম্বল করা হয়। কিন্তু এই ফোনগুলির সবচেয়ে দামি এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ, অর্থাৎ Processor Chip, এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাই সরকার এখন শুধু মোবাইল উৎপাদন নয়, চিপ উৎপাদনের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

ভারত কী ধরনের চিপ তৈরি করবে?প্রথম পর্যায়ে ভারতের Semiconductor Fab-এ 28nm থেকে 110nm পর্যন্ত চিপ তৈরি হবে। আসলে Nanometer (nm) যত কম হবে, চিপ তত বেশি দ্রুত, আধুনিক এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী হবে। 28nm থেকে 110nm-এর চিপ গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ, টেলিকম, শিল্প কারখানার যন্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য সম্পূর্ণ উপযুক্ত। অন্যদিকে, প্রিমিয়াম স্মার্টফোনে ব্যবহৃত 7nm, 5nm, 3nm এবং 2nm-এর মতো অত্যাধুনিক চিপ এখনও বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি দেশেই তৈরি হয়। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতও এই ধরনের অত্যাধুনিক চিপ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করবে।

গাড়ি এবং 5G নেটওয়ার্কের জন্য এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?বর্তমান সময়ের গাড়িকে অনেকেই চাকার উপর চলা কম্পিউটার বলে থাকেন। একটি আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়িতে হাজার হাজার চিপ ব্যবহার করা হয়। এই চিপগুলিই ব্যাটারি, ক্যামেরা, সেন্সর, এয়ারব্যাগ, ব্রেকিং সিস্টেম এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে।

একইভাবে 5G নেটওয়ার্ক, মোবাইল টাওয়ার এবং ডেটা সেন্টারও চিপ ছাড়া চালানো সম্ভব নয়। তাই সরকারের পরিকল্পনা, ভারতের প্রাথমিক Semiconductor Fab-গুলি প্রথমে এই খাতগুলির চাহিদা পূরণ করবে।

সাধারণ মানুষের কী লাভ হবে?এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় লাভ হবে কর্মসংস্থান। নতুন কারখানা, প্যাকেজিং ইউনিট এবং সেগুলির সঙ্গে যুক্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় হাজার হাজার প্রত্যক্ষ এবং লক্ষ লক্ষ পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়াদের জন্য Chip Design একটি বড় কেরিয়ারের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

তৃতীয় বড় সুবিধা হবে জাতীয় নিরাপত্তা। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিপ যদি দেশেই তৈরি হয়, তাহলে বিদেশের উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমবে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

  • এই পথ মোটেই সহজ নয়। একটি আধুনিক Semiconductor Fab গড়ে তুলতে ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
  • দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিগত। 7nm এবং তার থেকেও ছোট চিপ তৈরির প্রযুক্তি এখনও বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি সংস্থার কাছেই রয়েছে।
  • তৃতীয় চ্যালেঞ্জ দক্ষ বিশেষজ্ঞের অভাব। ভারতে ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা অনেক হলেও অত্যাধুনিক ফ্যাব পরিচালনার অভিজ্ঞতা এখনও সীমিত।
  • চতুর্থ বড় চ্যালেঞ্জ হল বিদ্যুৎ এবং জল। একটি চিপ কারখানা ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং অতিশুদ্ধ (Ultra-pure) জলের উপর নির্ভর করে। কয়েক সেকেন্ডের বিদ্যুৎ বিভ্রাটও কোটি কোটি টাকার ক্ষতি করতে পারে।
  • এছাড়া আমেরিকা, চিন, জাপান এবং ইউরোপও বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে সেমিকন্ডাক্টর সংস্থাগুলিকে নিজেদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে।
আগামী দিনে কোন বিষয়গুলির দিকে নজর রাখতে হবে?এখন মূলত তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, Semicon 2.0-এর বিস্তারিত নির্দেশিকা। এর মাধ্যমে জানা যাবে সংস্থাগুলি কী ধরনের সরকারি সহায়তা পাবে। দ্বিতীয়ত, ২০২৮ সাল। ওই বছর গুজরাটের ধোলেরা থেকে ভারতের প্রথম Made-in-India Silicon Chip উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, ২০৩৫ সাল। ওই সময়ের মধ্যে 3nm এবং 2nm-এর মতো বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক চিপ তৈরির সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে ভারত।

বর্তমানে ভারত চিপ উৎপাদনের দৌড়ে এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে প্রথমবারের মতো লক্ষ্য শুধু বিদেশ থেকে চিপ কেনা নয়, বরং গোটা সেমিকন্ডাক্টর শিল্প দেশেই গড়ে তোলা। আগামী কয়েক বছরেই বোঝা যাবে, ১.২৭ লক্ষ কোটি টাকার এই বড় বিনিয়োগ ভারতকে বিশ্বের অন্যতম বড় চিপ হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারে কি না।

(Feed Source: news18.com)