International
-Ritesh Ghosh
মেক্সিকোর দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে এক ভয়াবহ এবং শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৭.৪। মেক্সিকো ছাড়াও এই তীব্র কম্পন প্রতিবেশী গুয়াতেমালা এবং এল সালভাদরে জোরালোভাবে অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পের পরপরই সংশ্লিষ্ট উপকূলীয় অঞ্চলে সুনামি সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। হঠাৎ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, মেক্সিকোর চিয়াপাস রাজ্যের পুয়ের্তো মাদেরো শহর থেকে প্রায় ৭১ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রগর্ভে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল। প্রথম দিকে ভূকম্পনের গভীরতা ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে বলে জানানো হলেও, পরবর্তীতে তথ্য সংশোধন করে জানানো হয় যে মূল কম্পনটি সংঘটিত হয়েছে ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৫ কিলোমিটার গভীরে।

মূল কম্পনের পর চিয়াপাস ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে কয়েকটি শক্তিশালী আফটারশক অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এগুলির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৫.২, ৫.৮ এবং ৬.১। ঘনঘন আফটারশকের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরের ভেতর ফিরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। দুর্যোগ মোকাবিলা দফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই আফটারশক বা অনুষঙ্গিক কম্পনের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকতে পারে।
সুনামি সতর্কতা ও উপকূলবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা
ভূমিকম্পের তীব্রতা ও অবস্থান বিবেচনা করে মার্কিন সুনামি সতর্কীকরণ কেন্দ্র চিয়াপাস উপকূলের ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে সুনামি সতর্কতা জারি করে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সামুদ্রিক ঢেউ স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে, যা মেক্সিকো ও গুয়াতেমালার উপকূলবর্তী নীচু এলাকাগুলোকে প্লাবিত করতে পারে। মেক্সিকোর নৌবাহিনী স্থানীয় বাসিন্দাদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সমুদ্র সৈকত থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
মেক্সিকো ও গুয়াতেমালার সীমান্ত নির্ধারণকারী সুচিয়েট নদীর অববাহিকায় স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রের জলের স্তরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চিয়াপাসের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মৎস্যজীবী ও পর্যটকদের উপকূলবর্তী এলাকায় প্রবেশে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং নৌবাহিনীর রিভার পেট্রোলিং ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করা হয়েছে।
বহুতল থেকে মানুষের হুড়োহুড়ি ও আতঙ্ক
ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল থেকে কয়েক শত কিলোমিটার দূরে গুয়াতেমালা সিটিতেও তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। অফিস ও সাধারণ কাজকর্ম শুরু হওয়ার সময়ে এই কম্পন অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। বহুতল অফিস ও আবাসন থেকে শত শত মানুষ হুড়োহুড়ি করে খোলা রাস্তায় নেমে আসেন। প্রায় একই আতঙ্কজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এল সালভাদরেও।
দক্ষিণ মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তাপা চুলার একটি সরকারি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মী আলেজান্দ্রা মেন্দোসা তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, প্রথমে কম্পন মৃদু থাকলেও ধীরে ধীরে তা ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় অবস্থান করার সময় তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করায় চিকিৎসাকর্মী ও রোগীরা হুড়োহুড়ি না করে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নিচে নেমে আসেন এবং সামনের মাঠে আশ্রয় নেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও এবং ছবিতে দেখা গেছে, মানুষের ঘরের ভেতর আসবাবপত্র তীব্রভাবে দুলছে এবং তাক থেকে জিনিসপত্র নিচে পড়ে যাচ্ছে। গুয়াতেমালা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহর সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় ছোটখাটো ধস নামার খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রধান শহুরে এলাকাগুলোতে এখন পর্যন্ত পরিকাঠামোগত বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির বা ধসের ঘটনা সামনে আসেনি।
ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির সর্বশেষ পরিস্থিতি
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শিনবাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর চিয়াপাস ও তাবাস্কো রাজ্যে এখনও পর্যন্ত কোনো মৃত্যু বা মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পার্বত্য এলাকার কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম বাইরে থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট বার্নার্ডো আরেভালো ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে দেশের জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরে প্রশাসনিক নির্দেশিকা মেনে চলার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর উদ্ধারকারীরা প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা থেকে নিয়মিত আপডেট সংগ্রহ করছেন এবং সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে।
মেক্সিকো সিটিতে কেন বাজেনি সতর্কতা সাইরেন?
ভূমিকম্পের তীব্রতা এত বেশি হওয়া সত্ত্বেও মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা সাইরেন বাজেনি। এই নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা বিস্ময় ও প্রশ্ন দেখা দেয়। পরে সরকারের আবহাওয়া ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তর স্পষ্ট করে জানায়, কম্পনটির উৎপত্তিস্থল ওখান থেকে অনেক দূরে ছিল এবং প্রথম কয়েক সেকেন্ডে যে শক্তির তরঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল তা অ্যালার্ম বাজানোর সীমার অতিরিক্ত ছিল না।
প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’ বা অগ্নিবলয়ের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মেক্সিকো এবং সমগ্র মধ্য আমেরিকা অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। ভূতাত্ত্বিকরা জানান, কোকোস প্লেট ও উত্তর আমেরিকান প্লেটের পারস্পরিক সংযোগস্থলে তীব্র ঘর্ষণের কারণে এই ধরনের ঝাঁকুনি নিয়মিত ঘটনা। পূর্ববর্তী বিধ্বংসী অভিজ্ঞতা থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ এবং উদ্ধারকারী দলগুলো সর্বদা প্রস্তুত থাকেন।
আপাতত সুনামি ঢেউয়ের আশঙ্কা পুরোপুরি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সমুদ্রতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা মেক্সিকো এবং গুয়াতেমালার উদ্ধারকারী দলগুলো তল্লাশি অভিযান ও নজরদারি জারি রাখবে। প্রশাসনিক তৎপরতা এবং দীর্ঘদিনের দুর্যোগ প্রতিরোধের পরিকাঠামো প্রস্তুত থাকায় এই যাত্রায় বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেয়েছে এই অঞ্চল।
(Feed Source: oneindia.com)
