India
-Ritesh Ghosh
সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হতেই চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হল দেশের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। এদিন সোমবার শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল সংস্কারের দাবি তুলে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র পরিকল্পিত ‘সংসদ চলো’ অভিযানকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর চত্বর। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে এবং সংসদের অভিমুখে তাঁদের পদযাত্রা রুখতে ব্যাপক লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী। সপ্তাহের প্রথম দিনেই এই ধুন্ধুমার কাণ্ডকে কেন্দ্র করে থমথমে হয়ে পড়েছে গোটা এলাকার পরিবেশ।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় এবং যেকোনও ধরনের হিংসাত্মক পরিস্থিতি রুখতে দিল্লির স্পর্শকাতর এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করা হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাধারণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে দিল্লি মেট্রো রেল কর্পোরেশন (ডিএমআরসি) সোমবার রাজধানীর পাঁচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। রেল কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, পরবর্তী স্পেশাল নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে।

দিল্লি মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ তাদের ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করে। বন্ধ হওয়া স্টেশনগুলির তালিকায় রয়েছে রাজীব চক, জনপথ, প্যাটেল চক, কেন্দ্রীয় সচিবালয় এবং সেবা তীর্থ। সপ্তাহের প্রথম কাজের দিনেই আচমকা এই পাঁচটি স্টেশন বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েন হাজার হাজার নিত্যযাত্রী। অনেকেই অফিসের সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে না পেরে স্টেশন চত্বরেই ক্ষোভ উগরে দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজপথে অতিরিক্ত বিকল্প যানবাহনের বন্দোবস্ত দেখা যায়।
যন্তর মন্তরে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের তুমুল সংঘর্ষ
পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে ককরোচ জনতা পার্টির কর্মী-সমর্থকেরা সোমবার দিল্লির যন্তর মন্তরে জমা হতে শুরু করেছিলেন। বাদল অধিবেশনের প্রথম দিনেই আন্দোলনকারীরা নিজেদের দাবি সরকারের কানে পৌঁছে দিতে সংসদ ভবন অভিযানের লক্ষ্য স্থির করেন। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথম থেকেই গোটা এলাকা নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে রেখেছিল। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগোনোর চেষ্টা করলেই পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে দেখে লাঠি উঁচিয়ে বিক্ষোভকারীদের উপর চড়াও হয় পুলিশ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) বাহিনী। মুহূর্তের মধ্যে যন্তর মন্তর সংলগ্ন চত্বরে তীব্র আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। রণক্ষেত্রের পরিবেশ তৈরি হওয়া মাত্রই পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতি হয় বিক্ষোভকারীদের। ঘটনার বেশ কিছু লাইভ ও এক্সক্লুসিভ ফুটেজ সোশ্যালে ভাইরাল হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কিভাবে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠি চালাচ্ছে জওয়ানেরা।
নতুন দিল্লিতে বিএনএসএস-এর ধারা ১৬৩ জারি
চলতি বাদল অধিবেশন ঘিরে এমনিতেই নতুন দিল্লির কেন্দ্রস্থলে কড়া প্রশাসনিক সতর্কতা জারি রয়েছে। এই গোলমালের পর দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) শপ্রেম শচীন শর্মা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ককরোচ জনতা পার্টির ওই পরিকল্পিত পদযাত্রা বা সংসদ অভিযানের জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো বৈধ আবেদন করা হয়নি এবং পুলিশের তরফেও কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। ফলে বিনা অনুমতিতে এহেন বড়সড় অবৈধ জমায়েতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নিরাপত্তা দপ্তর।
আইন অমান্যকারীদের সতর্ক করে দিল্লির ডিসিপি আরও জানিয়েছেন, সাধারণ শান্তি রক্ষার্থে নতুন দিল্লি এলাকা জুড়ে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা অর্থাৎ বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। এই আইনের নিয়ম অনুযায়ী, যন্তর মন্তরের জন্য নির্দিষ্ট সুরক্ষিত বিক্ষোভের স্থলটি বাদ দিয়ে নতুন দিল্লির অন্য কোথাও পাঁচ বা তার বেশি মানুষের কোনো রকম অবৈধ সমাগম, প্রতিরোধ মিছিল ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা আইনত দণ্ডনীয়। অবাধ্যেদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)-এর ২২৩ ধারা অনুযায়ী মামলা রুজু করা হবে।
অনশন ও আগামী কর্মসূচির জেরে উদ্বেগ
দিল্লির এই উত্তেজনার আবহ তৈরি হওয়ার পেছনে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে। লাদাখ ভবনে অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সম্প্রতি তাঁকে সফদরজং হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে পুলিশ। এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। হাসপাতাল থেকেই ওয়াংচুক সমর্থকদের বার্তা পাঠিয়ে ২০ জুলাইয়ের প্রস্তাবিত সংসদ চলো অভিযানে বিপুল সংখ্যায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আন্দোলনকারীদের এমন তীব্র অনড় জেদ ও ভবিষ্যৎ প্রতিবাদের পরিকল্পনা মাথায় রেখে দিল্লির সংসদ মার্গ, সেন্ট্রাল ভিস্তা, কনট প্লেস ও শঙ্কর চকের মতো সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক চত্বরের নিরাপত্তা মারাত্মক বাড়ানো হয়েছে। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৈরি রয়েছে কুইক রেসপন্স টিমও (কিউআরটি)। রাজপথের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে অতিরিক্ত সিসিটিভি নজরদারির পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে।
সংসদের গুরুত্বপূর্ণ বাদল অধিবেশন চলাকালীন শিক্ষা সংস্কারের মতো সংবেদনশীল বিষয়ের দাবিতে ছাত্র ও যুব সমাজের এই অভূতপূর্ব প্রতিবাদ সংসদীয় রাজনীতির অলিন্দেও বড় সাড়া ফেলেছে। পুলিশের কড়া মনোভাব এবং বিক্ষোভকারীদের জেদি লড়াই রাজপথে যে সংঘর্ষের জন্ম দিল, তা আগামী দিনে আরও বড় আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। দিল্লির এই থমথমে জনজীবন কবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।
(Feed Source: oneindia.com)
