West Bengal-Ritesh Ghosh
দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কার্যালয় ভাঙার প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল কলকাতা হাইকোর্ট। রবিবার আদালতের এই তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে বড়সড় স্বস্তি পেলেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ। হাইকোর্ট স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে, পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ওই বিতর্কিত জমিতে কোনও ভাঙচুর চালানো যাবে না এবং বর্তমান পরিস্থিতি যেমন আছে তেমনই অর্থাৎ স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।
রবিবার সকালে আমতলার ওই সাংসদ কার্যালয়ে আচমকাই প্রশাসনের উদ্যোগে বুলডোজার চালানো হয়। এর পরেই আদালতের দ্রুত হস্তক্ষেপ চেয়ে তড়িঘড়ি আবেদন জানায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পারিবারিক সংস্থা ‘লিপস অ্যান্ড বাউন্স’। বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার জরুরি শুনানি হয়। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, জমির মালিকানার সমস্ত আইনি নথিপত্র বৈধ থাকা সত্ত্বেও কোনও নোটিশ ছাড়াই এই বেআইনি উচ্ছেদ করা হয়েছে।

আইনি লড়াই ও আদালতের জরুরি হস্তক্ষেপ
মামলাকারীদের পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে সওয়াল করার সময় জানান, এই জমি সংক্রান্ত একটি বিষয় যখন আদালতের বিবেচনাধীন রয়েছে, তখন কীভাবে প্রশাসন এমন একতরফা পদক্ষেপ করতে পারে। সমস্ত পক্ষের যুক্তি শোনার পর বিচারপতি এই ভাঙার কাজ অবিলম্বে বন্ধ করার নির্দেশ দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্তে আপাতত স্বস্তির হাওয়া তৃণমূল শিবিরে। পরবর্তী শুনানির আগে এখানে কোনও নতুন পদক্ষেপ করা সম্ভব হবে না।
উল্লেখ্য, আমতলার এই কার্যালয়টি দীর্ঘ সময় ধরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী মণ্ডলীর কাজ পরিচালনা ও মানুষের পরিষেবা দিতে ব্যবহার করা হতো। আবেদনকারী সংস্থার অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ন্যূনতম আইনি সৌজন্য না দেখিয়ে ছুটির দিনে এভাবে উচ্ছেদ চালানো হয়েছে। আদালতের রায়ের পর রণক্ষেত্রের রূপ নেওয়া আমতলা এলাকায় নতুন করে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোনও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।
‘পোশাকি চুরি’র গুরুতর অভিযোগ ও সুর চড়ালেন অভিষেক
এই ঘটনার পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে একটি কড়া পোস্ট করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি সরাসরি রাজ্য পুলিশের একাংশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টের একাধিক পূর্ববর্তী রায় ও নির্দেশিকাকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই বেআইনিভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
সাংসদের অভিযোগ আরও চাঞ্চল্যকর। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও উল্লেখ করে দাবি করেন, ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি পুলিশ কর্মীদের মদতেই সেখানে ব্যাপক লুঠপাট চালানো হয়েছে। তাঁর কথায়, এটি কোনো প্রশাসনিক উচ্ছেদ নয়, বরং এক ধরনের ‘পোশাকি চুরি’। পুলিশের পোশাকে এসে কিছু কর্মী বিজেপি আশ্রিত দুষ্কৃতীদের সঙ্গে মিলে অফিসের অত্যন্ত মূল্যবান ল্যাপটপ, প্রিন্টার, জরুরি নথিপত্র এবং আসবাবপত্র চক্রান্ত করে নিয়ে গেছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাংলায় আইনের শাসন আজ সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন। যখন একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, তখন প্রশাসন কীভাবে আইনি পথ এড়িয়ে এই ধ্বংসলীলা চালাল তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। শাসক দলের দাবি, এই চক্রান্তের পিছনে বিরোধী শিবিরের গভীর যোগসূত্র রয়েছে এবং প্রশাসনকে উসকে এই বেআইনি কাজ হাসিল করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সংঘাতের উত্তপ্ত ইতিহাস
আমতলার এই কার্যালয়টিকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, পূর্বে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ঠিক পরেই এই কার্যালয়ে একদল লোক তাণ্ডব চালায় এবং ভাঙচুর করে। সেই সময়েও তৃণমূলের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ রুজু করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশের তরফ থেকে কোনওরকম সদর্থক পদক্ষেপ মেলেনি বলে দাবি করা হয়।
এরপর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল শাসক দল। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে সেই মামলাটি শুনানির জন্য নথিবদ্ধ থাকলেও, দীর্ঘ সময় তা শুনানির অপেক্ষায় পড়ে ছিল। তবে রবিবারের এই আকস্মিক উচ্ছেদ অভিযান বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিল। তৃণমূলের দাবি, পূর্বের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না করে উলটে কার্যালয়টি ভেঙে দেওয়ার পদক্ষেপ তীব্র অন্যায়।
বিরোধী দল বিজেপির পক্ষ থেকে অবশ্য তৃণমূলের তোলা সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের পাল্টা দাবি, প্রশাসনের এই কাজ সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই হয়েছিল এবং সেখানে কোনো বেআইনি কাজের সাথে বিজেপি যুক্ত নয়। বিরোধী নেতৃত্বের বক্তব্য, সরকারি বেআইনি নির্মাণ ভাঙার ক্ষেত্রে প্রশাসনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে তৃণমূল জোর করে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বুলডোজার সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ ও আইনি লড়াই
সাম্প্রতিককালে দেশজুড়ে বিনা নোটিশে বাড়ি বা কার্যালয় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে জাতীয় স্তরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতও একাধিকবার জানিয়েছে যে, আইন ও ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো যায় না। আমতলার ক্ষেত্রেও আইনি নিয়মকানুন লঙ্ঘন হয়েছে কিনা, আগামী দিনে হাইকোর্টের এজলাসে সেই সত্যের মীমাংসা হবে।
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পর সরকারি দফতর বা রাজ্য পুলিশ মহলের তরফ থেকে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে রবিবারের এই ঘটনার গভীরতা বুঝে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের অন্দরেও প্রবল চাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। ছুটির দিনে কোন প্রভাবে তড়িঘড়ি এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হল এবং নথির সত্যতা কতটা খতিয়ে দেখা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরেই শুরু হয়েছে পর্যালোচনা। মামলার পরবর্তী শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সব পক্ষ।
(Feed Source: oneindia.com)
