)
Taslima Nasrin in Kolkata: নিজের লেখালেখির কারণে বারবার আক্রমণের শিকার হওয়া তসলিমা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ধর্মীয় মৌলবাদী এবং তথাকথিত প্রগতিশীলদের মুখোশ উন্মোচন করে বলেন, “ইসলামী জিহাদিরা সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে হত্যাকে হাতিয়ার করে, আর তথাকথিত সেক্যুলার বামপন্থীরা ব্যবহার করে কুৎসা ও অপবাদ।”
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: “আজ কলকাতায় ফিরেছি, এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার ১৯ বছর লেগে গেল… দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ আমি আমার হারিয়ে যাওয়া জীবনের এক মূল্যবান অধ্যায়ের কাছে ফিরে এসেছি।” দীর্ঘ নির্বাসন ও প্রতিকূলতার প্রহর পেরিয়ে কলকাতায় ফিরে এভাবেই নিজের হৃদয়ের অর্গল খুলে দিলেন বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বরের সেই কালো দিনের স্মৃতি ভেঙে এই অগাস্টেই ঘটল তাঁর প্রত্যাবর্তন। কলকাতায় পা রেখেই তিনি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন শিবনারায়ণ রায় এবং অম্লান দত্তের মতো মনীষীদের, যাঁদের নীতি ও আদর্শ তাঁর লড়াইয়ে চিরকাল আলো জুগিয়েছে।
কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়া এবং নিজের মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার যন্ত্রণা ব্যক্ত করে তসলিমা বলেন, “রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। রাতের অন্ধকারে আমার নিজের দেশ আমার জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভয় কিংবা অন্যায় কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না। যে শহর একদিন আমাকে কাঁদিয়ে তাড়িয়েছিল, আজ সেই শহরই আমাকে পরম মমতায় ফিরিয়ে নিয়েছে। আজ নির্বাসনের ওপর বাকস্বাধীনতার জয় হল।”
‘অগাস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাস’
প্রায় দুই দশক পর অবশেষে প্রিয় শহর কলকাতায় ফিরেছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রকাশিত হয় তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘আত্মজীবনী সমগ্র’। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে লেখিকাকে সাদর অভ্যর্থনা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিজের সুরক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে মঞ্চে বক্তব্য রাখতে ওঠেন তসলিমা। বাকস্বাধীনতার পক্ষে জোর সওয়াল করে তিনি বলেন— অগাস্ট আমার জন্মের মাস, অগাস্টই আমার নির্বাসনের মাস, আর আজ থেকে এই অগস্ট হয়ে রইল আমার প্রত্যাবর্তনের মাস।”
মৌলবাদ ও ভণ্ড প্রগতিশীলদের মুখোশ উন্মোচন
নিজের লেখালেখি ও মতাদর্শের কারণে বারবার আক্রমণের শিকার হওয়া এই লেখিকা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ধর্মীয় মৌলবাদী এবং তথাকথিত প্রগতিশীলদের একহাত নেন। বলেন, “ইসলামী জিহাদিরা সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে হত্যাকে হাতিয়ার করে, আর তথাকথিত সেক্যুলার বামপন্থীরা ব্যবহার করে কুৎসা ও অপবাদ।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন— “আমি তো সহজ কথা লিখেছিলাম। আমি কি কাউকে হত্যা করেছি? তবুও আমাকে কেন এই শাস্তি দেওয়া হল? একজন নিরস্ত্র লেখককে সরিয়ে সাময়িক নীরবতা আনা যায়, কিন্তু প্রশ্নকে কখনও হত্যা করা যায় না। যাঁরা নিজেদের জীবনের জন্য আধুনিকতা চান, কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য সেই আধুনিকতা চান না—তাঁরা আর যাই হোক, প্রগতিশীল নন।”
‘দ্বিমত প্রকাশে বিদ্বেষের প্রয়োজন নেই’
রাজনৈতিক কোনও প্রচারের জন্য তিনি আসেননি উল্লেখ করে তসলিমা জানান, অশুভ মতাদর্শের বিরুদ্ধে কথা বলা তাঁর মৌলিক অধিকার। “কারও প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মানে আনুগত্যের চুক্তি সই করা নয়। মতভিন্নতা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য, আর দ্বিমত প্রকাশ করতে হলে বিদ্বেষের প্রয়োজন হয় না। একজন লেখককে নিজের ভাষার শহরে পুলিসের পাহাড়ায় আসতে হচ্ছে—এমন দিন যেন আর কোনও লেখককে দেখতে না হয়।”
সীমান্তের ওপারেও এক ভাষার ঘর
রাজনীতি ও ভৌগোলিক কাঁটাতারের ঊর্ধ্বের সত্যকে তুলে ধরে তসলিমা নাসরিন বলেন, “রাজনীতি যখন বাংলাকে ভাগ করেছিল, কবিতা তখন দুই বাংলার মধ্যে সেতু তৈরি করেছিল। কাঁটাতার কখনও ভূখণ্ড বা মনকে ভাগ করতে পারে না। এক বাংলায় আমার জন্ম, আর আরেক বাংলায় আমি ঘর পেয়েছিলাম। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঘর তো তৈরি হয় ভাষা আর ভালোবাসায়।” নিজের বক্তব্যের শেষে এক গভীর সত্য উচ্চারণ করে তিনি জানান, কোনও রাজনৈতিক মানচিত্র নয়—”মানুষের ভালোবাসাই আমার আসল দেশ।”
প্রসঙ্গত, ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তে কীভাবে তাঁকে তড়িঘড়ি কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল, তাও স্মরণ করেন লেখিকা। মনে করান, তাঁর লেখা ‘দ্বিখণ্ডিত’ বইটি নিষিদ্ধ করা হলেও কলকাতা হাইকোর্ট সেই নির্দেশ খারিজ করেছিল। তা সত্ত্বেও মৌলবাদীদের তোষণের মূল্য হিসেবে তাঁকে রাজ্য ছাড়তে হয়েছিল।
(Feed Source: zeenews.com)
