)
ভারত কেন অন্যতম আধুনিক স্টেলথ যুদ্ধবিমান F-35 কিনছে না? তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্ভাব্য F-35 চুক্তি, ন্যাটো, আত্মনির্ভর ভারত ও বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষণ পড়ুন। জলের মতো বুঝে নিন এই যুদ্ধবিমান নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন সমীকরণ
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিশ্বের অন্যতম আধুনিক স্টেলথ যুদ্ধবিমান F-35 Lightning II। লকহিড মার্টিনের তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত, বহুমুখী ও সর্বাধিক ব্যবহৃত পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম। আধুনিক সামরিক প্রযুক্তিতে একে আকাশযুদ্ধের ‘কোয়ার্টারব্যাক’ বা অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবেও গণ্য করা হয়। এই F-35 Lightning II-কে ঘিরে ফের আন্তর্জাতিক কূটনীতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় এক নতুন মাত্রা জুড়েছে। আমেরিকা একদিকে সৌদি আরবের কাছে F-35 বিক্রির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। আবার অন্যদিকে তুর্কিয়ে ফের এই কর্মসূচিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ভারত কেন এই সুযোগে F-35 কেনার পথে হাঁটল না? ভবিষ্যতের যুদ্ধনীতি, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত ভারসাম্যের নিরিখে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্যই বা ঠিক কী? ভারতের কি এখন রাশিয়ার থেকে Su-57 কেনার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা উচিত?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমেরিকা সফরের সময় ভারতকে F-35 যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে ভারতের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়, যা শুধুই প্রস্তাব। বিদেশসচিব বিক্রম মিশ্রি জানিয়েছেন, F-35 কেনার কোনও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এবং সরকারও এমন কোনও সিদ্ধান্তও নেয়নি। না কেনার নেপথ্যে রয়েছে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা নীতি। নয়াদিল্লি এখন এমন একটি সামরিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে বিদেশি অস্ত্রের উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে এবং দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। মোদীর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এর অধীনে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দেশেই তৈরি করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই কাজও চলছে
কেন দেশীয় যুদ্ধবিমান ভারতের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
বিদেশি যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে শুধু বিমান কেনাই তো শেষ কথা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট, স্পেয়ার পার্টস, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অস্ত্র সংযুক্তির মতো একাধিক বিষয়। কোনও রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হলে এই পরিষেবাগুলিও প্রভাবিত হতে পারে। অন্যদিকে দেশীয় ভাবে তৈরি যুদ্ধবিমান ভারতের হাতে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্র সংযুক্ত করা, প্রযুক্তি আপগ্রেড করা কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। এই কারণেই তেজস Mk-1A-কে ভারতীয় বায়ুসেনার ভবিষ্যতের অন্যতম প্রধান যুদ্ধবিমান হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। উন্নত AESA রাডার, আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং দেশীয় অস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে তেজসকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। পাশাপাশি LCA Mk-2, AMCA (Advanced Medium Combat Aircraft) এবং অন্যান্য দেশীয় প্রকল্প ভারতের ভবিষ্যৎ বিমান শক্তির ভিত্তি তৈরি করছে। ভারত ইতোমধ্যেই তেজস Mk-1A প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং ৮৩টি যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে বড় উৎসাহ দিয়েছে। এর ফলে শুধু বায়ুসেনাই নয়, হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি সংস্থাও লাভবান হচ্ছে।
তুর্কিয়ের F-35 প্রত্যাবর্তন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
তুর্কিয়ে ১৯৫২ সাল থেকে ন্যাটোর সদস্য এবং ইউরোপ, কৃষ্ণসাগর, ককেশাস ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। একসময় তুর্কিয়ে F-35 কর্মসূচির অন্যতম অংশীদার ছিল। কিন্তু রাশিয়ার S-400 ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর ওয়াশিংটন আশঙ্কা প্রকাশ করে যে F-35-এর অত্যাধুনিক স্টেলথ প্রযুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এরপরই তুর্কিয়েকে ওই কর্মসূচি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এখন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তুরস্কের দাবি, F-35 কর্মসূচিতে ফিরতে পারলে ন্যাটোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত এখনও S-400 ইস্যুর সমাধান, মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন এবং নিরাপত্তা মূল্যায়নের উপর নির্ভর করছে।
সৌদি আরব F-35 পেলে কী বদলাবে?
যদি সৌদি আরব F-35 পায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান সৌদি বিমানবাহিনীর আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই ইজরায়েলের Qualitative Military Edge (QME) বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। ফলে সৌদি আরবকে F-35 দেওয়ার আগে ওয়াশিংটনকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইজরায়েলের কৌশলগত সুবিধা এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ—সবকিছুই বিবেচনা করতে হবে। কারণ F-35 শুধু যুদ্ধবিমানই নয়, কূটনীতিরও হাতিয়ার F-35 বিশ্বের সবচেয়ে সফল বহুজাতিক প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলির একটি। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একাধিক মিত্র দেশ এই প্রকল্পে যুক্ত রয়েছে। যারা F-35 ব্যবহার করে, তারা শুধু একটি যুদ্ধবিমানই পায় না; তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, যৌথ প্রশিক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রতিরক্ষা সমন্বয়ের অংশ হয়ে ওঠে।এই কারণেই F-35 রফতানি ভবিষ্যতের সামরিক জোট এবং প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চিনের মধ্যে যুদ্ধবিমান রপ্তানির প্রতিযোগিতাকেও আরও তীব্র করে তুলছে।
ভারতের সামনে কী পথ?
ভারত একদিকে ফ্রান্স, আমেরিকা, রাশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে দেশীয় প্রযুক্তিতে ভবিষ্যতের যুদ্ধবিমান তৈরির উপর জোর দিচ্ছে। তেজসের পাশাপাশি AMCA, উন্নত ইঞ্জিন প্রযুক্তি, দেশীয় রাডার, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধ ব্যবস্থা আগামী দিনের ভারতীয় বিমান শক্তির মূল ভিত্তি হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি প্রযুক্তি থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলাই সবচেয়ে লাভজনক কৌশল। কারণ যুদ্ধবিমান শুধু একটি অস্ত্র নয়, এটি একটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিল্পশক্তি এবং কৌশলগত স্বাধীনতার প্রতীক।
(Feed Source: zeenews.com)
