
‘স্বর্ণমৃগ’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘আশ্বিন মাসে দুর্গোৎসব নিকটবর্তী হইল। চতুর্থীর দিন হইতে ঘাটে নৌকা আসিয়া লাগিতে লাগিল। প্রবাসীরা দেশে ফিরিয়া আসিতেছে। টিনের বাক্সের মধ্যে ছেলেদের জন্য জুতা, ছাতা, কাপড় এবং প্রেয়সীর জন্য এসেন্স, সাবান, নূতন গল্পের বহি এবং সুবাসিত নারিকেল তৈল।’
‘কোলাবলরামপুরে ঝাঁঝাঁ করছে শরতের দ্বীপ্রহর৷ নিবিড় বাঁশবনে ঘুঘু ডাকছে উদাস মধ্যাহ্নবেলায়৷ বনে বনে তিত্পল্লার হলুদ ফুল ফুটেছে৷ যতীন অনেকদিন পরে বাংলার শরতের এ সুপরিচিত দৃশ্যগুলো দেখলে৷ বাঁশঝাড়ে সোনার সড়কির মতো নতুন বাঁশের চারা ঠেলে উঠেছে, বনসিমতলায় বেগনি ফুল ফুটে ঝোপের মাথা আলো করছে৷ বর্ষার শেষে জল সরে যাচ্ছে ডোবায়৷ পুকুরে নদীতে তীরের টাটকা কাদায় সাদা বক গেঁড়ি-গুগলি খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ জলের ধারেই কাশফুলের ঝাড় থেকে হাওয়ায় কাশফুলের সাদা তুলোর মতো পাপড়ি উড়ছে…’
আমরাও এক একজন যতীন৷ শুধু রক্তমাংসের, এই যা! আমরা ফ্যালফ্যাল চোখে শরতকে দেখি৷ দেখি আশ্বিনের একচিলতে রোদ সাতরঙা এক পাখি হয়ে উড়ে উড়ে বেড়ায় নতুন বেডকভারে, মাঠে ডাঁই করা বাঁশে, পুজোবার্ষিকী হয়ে কোনও সমুদ্ররঙা পাঞ্জাবি কিংবা সাদা শাড়ির, লাল পাড় আঁচলে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে ঠাকুর আসে মুখ বেঁধে। সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে বন্ধুকে ডাকতে যাই। প্রতিবছর অষ্টমীতে একটাই পাঞ্জাবি, দেবীর পায়ের তলায় রাখা জলদর্পণে তাঁর আবছা মুখ। শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি যাওয়া, যেখানে নদীর ধারে ভরে আছে কাশ। অপেক্ষার বয়স কমলে মফঃস্বলের স্টেশন বাজারে কলেজ ফিরতি মেয়েদের ভিড় বাড়ে। পাড়ার মোড়ের সেলুনে সবাই তখন বায়োস্কোপের নায়ক। অপেক্ষার বয়স ফুরিয়ে গেলে ক্যালেন্ডারে লাল কালি পড়ে। অঙ্কের বই কুলুঙ্গিতে ওঠে আর তারিখ হয় বচ্ছরকার দিন। সানাই বাজে, আবার লাউডস্পিকারও৷ এ আনন্দ যেন সেই প্রথমদিন থেকে সেই এক, এ অপেক্ষা যেন অন্তহীন, সেই কোন কালের৷
‘আমাাদের শৈশবে দেখেছি যে কলিকাতায় অনেক বাটীতে দুর্গাপূজা হইত৷… আমরা যখন শিশু, তখন ডাকের গহনা উঠে নাই, মাটির গহনা হইত৷ সে বেশ সুন্দর ছিল৷… বিল্ববরণ রাতে হইত৷ নব-পত্রিকার স্নান হইতে শুরু করিয়া খুব একটা আনন্দ স্রোত বহিত৷ বিশেষ আমোদের ছিল নীল মাখানো কোরা কাপড় পরে ঢুলীদের বাজনার সঙ্গে ছেলেদের নাচা৷’ (মহেন্দ্রনাথ দত্ত)
পড়ে যায় ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘উৎসব’ ছবির কথা। সাজি ভরে শিউলি ফুল তুলে ঘরে ঘরে দিয়ে আসছে প্রেমের ছোঁয়া লাগা সদ্য যুবতী। গাছের প্রথম ফুল। তা তো কারও একার নয়। দূর থেকে শোনা যাচ্ছে পাড়ার ক্লাবের ঢাকের শব্দ। পাটভাঙা শাড়ির কুঁচিতে ঢেকে যাচ্ছে বচ্ছরভরের সঞ্চিত আবর্জনা। যেই পুজোয় এককালে এক হাজার টাকার বাজি পোড়ানো হত, দু হাজার লোক খেত, জার্মানি থেকে গয়না আসত, সেই পুজো আজ ম্লান। তবু টিমটিম করে জ্বলছে শেষ সলতেটুকু। ছোট মেয়ের বিবাহ-বিচ্ছেদ, মেজো মেয়ের অসম সম্পর্ক, পুজোর মাঝে বাড়ির ছেলের চাকরি হারানোর খবর, দুই-ভাই বোনের মধ্যে ফুটতে থাকা নতুন প্রেমের কুঁড়ি, ইতিহাসের এক অভিশপ্ত পুনরাবৃত্তি সবকিছুকে সরিয়ে রেখে যেখানে মুখ্য চরিত্র হয়ে ওঠে শুধুই ‘উৎসব’। যার শেষে কোন ছু-মন্তরে ঘুচে যায় বিষাদের অন্ধকার। এটাই তো পুজো, সব ‘উৎসব’-ই পুজো৷
আরেকটা দিন কেটে যায়। ধানের খেতে চলে রৌদ্রছায়ার খেলা। আকাশ কখনও কালো, পরক্ষণেই নীল। ভোরের আলো ফুটতেই শিউলিগাছের তলাটা যেন ধবধবে সাদা। রাত বাড়লেই হালকা হিমের আমেজ আর বহুদূর থেকে ভেসে আসা ঢাক। সেই বহুদূরেই হয়তো থাকে কারও প্রিয়জন। যেমন প্রিয়জনের থেকে দূরে থাকা সরলা বসু লিখছেন জল-বনের কাব্যে… ‘জলের কিনারে কলমী ঝোপেও নীল কলমী ফুল৷ খৈয়ের মতো ফুটে আছে সাদা ছোট্ট-ছোট্ট শালুক ফুলগুলি৷ জলাটা যেন রূপকথার মালঞ্চ বন৷ সত্যিই শরতের ধরা-ভরা সুন্দরবন মানুষকে আকুল করে, মুগ্ধ করে তোলে৷ উচ্ছ্বসিত পূর্ণা কপোতাক্ষী, ওপারের পল্লবাকীর্ণ বনশ্রী অতিবড় রিক্ত মনকেও পূর্ণ করে দেয়৷ ভাদ্রের রৌদ্রে হীরকের মতো ঝিকমিক করে জলস্রোত৷’
মেয়ের জন্য কাপড় আর আলতার পাতা নিয়ে হরিহর যখন বাড়ি ফেরে তখন তার বাড়ির ‘দুগ্গা’র বিসর্জন হয়ে গিয়েছে। গরম রৌদ্রের গন্ধ, নীল নির্মেঘ আকাশ, বর্ষা শেষের সরস সবুজ লতাপাতা সব আছে, নেই শুধু সেই বালিকা। অপুর মনে পড়ে তাদের কোঠাবাড়ি, আতুরী ডাইনি, নদীর ঘাট, কতদিনের কত হাসির খেলা, দিদির মুখ, দিদির না মেটা সাধের কথা। দিদির অপেক্ষার কথা। পাতালকোঁড়ের তরকারী দিয়ে ভাত খেতে খেতে দুর্গা হিসাব করেছিল, পুজোর আর ২২ দিন।
