)
বিশ্বকবির প্রয়াণের দিনে নিমতলা শ্মশানে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনা ভুলতে পারেননি মৃণাল সেন। এক অসহায় পিতার কোলের মৃত শিশু হারিয়ে গিয়েছিল জনসমুদ্রে! সেই স্মৃতি থেকেই তৈরি ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’। সেন্সর বোর্ডের প্রচণ্ড চাপ এবং ‘অশ্রদ্ধার’ অভিযোগ সত্ত্বেও কেন ছবির নাম বদলাতে রাজি হননি কিংবদন্তি পরিচালক? জানুন সেই ঐতিহাসিক বিতর্কের পেছনের গল্প
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ১৯৪১ সালের ৭ই অগাস্ট, বাংলা ক্যালেন্ডারে যা ছিল ২২শে শ্রাবণ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণবার্তায় সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ। স্কটিশ চার্চ কলেজের ক্লাস ছেড়ে খালি পায়ে জোড়াসাঁকোর দিকে ছুটে গিয়েছিলেন এক যুবক— তিনি পরবর্তীতে বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক ও শোকাকুল দিনে জোড়াসাঁকো থেকে নিমতলা শ্মশান পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে মৃণাল সেন এমন এক দৃশ্য দেখেছিলেন, যা তাঁর জীবনের গতিপথ এবং চলচ্চিত্র ভাবনাকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।
কবির মরদেহ যখন নিমতলা শ্মশানের দিকে এগোচ্ছিল, তখন শোকস্তব্ধ মানুষের ভিড় সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ভিড় এড়িয়ে কিছুটা আগেই শ্মশানে পৌঁছে যান যুবক মৃণাল। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, প্রায় পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের এক শোকার্ত পিতা তাঁর মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে শেষকৃত্যের জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু বিশ্বকবির শবদেহ শ্মশানে পৌঁছতেই শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা ও মানুষের তাণ্ডব। পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। সেই চরম জনসমুদ্র আর হট্টগোলের মধ্যে মানুষের পায়ে পিষে হারিয়ে যায় সেই অসহায় পিতার মৃত শিশুটির দেহ।
ঐতিহাসিক জাতীয় শোকের মাঝে এক সাধারণ মানুষের এই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি মৃণাল সেনের মানসপটে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল।
সেন্সর বোর্ডের বিরোধিতা ও মৃণাল সেনের জেদ
এই ঘটনার ঠিক ১৯ বছর পর, ১৯৬০ সালে মৃণাল সেন তাঁর তৃতীয় পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি তৈরি করেন। একটি সাধারণ দম্পতির বিয়ের তারিখ থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত ভাঙাগড়ার গল্প নিয়ে তৈরি এই ছবির নাম তিনি রাখতে চেয়েছিলেন ‘বাইশে শ্রাবণ’। কিন্তু রবীন্দ্রপ্রয়াণ দিবসের সঙ্গে এই নাম যুক্ত থাকায় সেই সময়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অধ্যাপক অপূর্ব চন্দ এবং সেন্সর বোর্ডের সদস্য অশোকা গুপ্ত সহ একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ তোলেন যে, এই নাম ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথের প্রতি অশ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
সেন্সর বোর্ড তাঁকে ছবির নাম বদলে ‘তেইশে শ্রাবণ’ করার অনুরোধ জানায় এবং তাঁকে “ছেলেমানুষ ও জেদি” বলে তোপ দাগে। কিন্তু অনড় ছিলেন মৃণাল সেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, তাঁর ছবির সঙ্গে কবির মৃত্যুর সরাসরি সংযোগ না থাকলেও, বাইশে শ্রাবণের দিনে শ্মশানে দেখা সেই চোখ জল আর সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত বিপর্যয়কে সেলুলয়েডে ধরে রাখার পূর্ণ অধিকার তাঁর আছে।
দিল্লি থেকে অবশেষে মিলল ছাড়পত্র
কলকাতায় সেন্সর বোর্ডের সাথে দীর্ঘ বাদানুবাদ ও বিতর্কের পর কোনো সুরাহা না হওয়ায় বিষয়টি পাঠানো হয় দিল্লিতে। অবশেষে দিল্লি সেন্সর বোর্ড থেকে ছবিটি কোনো নাম পরিবর্তন ছাড়াই ‘বাইশে শ্রাবণ’ হিসেবেই প্রদর্শনের সবুজ সংকেত পায়। যদিও ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি, তবুও বিশ্বকবির প্রয়াণ দিবসের আড়ালে এক সাধারণ মানুষের কান্নাকে ধরে রাখার মৃণাল সেনের এই শৈল্পিক জেদ আজও বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়।
(Feed Source: zeenews.com)
