
Business-Ritesh Ghosh
ভারতীয় রেলের টিকিট বুকিংয়ের অভিজ্ঞতা এবার আরও সহজ হতে চলেছে। রেল মন্ত্রকের পক্ষ থেকে আইআরসিটিসি (IRCTC) ওয়েবসাইটের একটি নতুন ‘বিটা ভার্সন’ (Beta) চালু করার ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন রাত ৯টা থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এই নতুন পোর্টালটি সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের গ্রাহক অসন্তোষ দূর করতেই রেলের এই বড় পদক্ষেপ।
রেল সফরের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটিকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ কোনওরকম কারিগরি জটিলতা ছাড়াই দ্রুত ট্রেনের টিকিট কাটতে পারেন। পুরনো ওয়েবসাইটের হোমপেজে গিয়েই নতুন এই পরীক্ষামূলক সংস্করণের লিঙ্ক বা ইউআরএল পেয়ে যাবেন গ্রাহকেরা। নতুন ডিজাইনে টিকিট কাটার পুরো প্রক্রিয়াটিকে যেমন অনেক বেশি গতিশীল করা হয়েছে, তেমনই বাদ দেওয়া হয়েছে অপ্রয়োজনীয় ধাপগুলিও।

নতুন এই বিটা সংস্করণে মূলত চারটি প্রধান পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে ভারতীয় রেল। প্রথম ও বড় বদলটি হল, নতুন ওয়েবসাইট থেকে সমস্ত অপ্রয়োজনীয় ‘ক্যাপচা’ (Captcha), বিজ্ঞাপনের পপ-আপ এবং অতিরিক্ত ফ্ল্যাশিং গ্রাফিক্স সম্পূর্ণ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। টিকিট কাটার সময় বিভ্রান্তিকর বা বিরক্তিকর কোনও বিজ্ঞাপনের মুখোমুখি হতে হবে না যাত্রীদের। এর ফলে স্ক্রিন লোড হতে সময় কম লাগবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাটি হল দূরপাল্লার ট্রেনের বিভিন্ন ক্লাসের টিকিট সহজে খোঁজা সংক্রান্ত। এখন থেকে যাত্রীরা খুব সহজেই একই পাতায় ট্রেনের সমস্ত ক্লাসের আসন ফাঁকা রয়েছে কিনা, তা এক নজরে দেখে নিতে পারবেন। আলাদা আলাদা ক্লিক করে প্রতিটি ক্লাসের সিট দেখার যে ঝামেলা আগে পোহাতে হতো, তা এই নতুন পদ্ধতিতে এক লহমায় দূর হবে।
তৃতীয়ত, টিকিট বুকিংয়ের শেষ ধাপে পেমেন্ট বা চেকআউট প্রক্রিয়াকে আগের চেয়ে অনেক দ্রুত ও সাবলীল করা হয়েছে। টিকিট কাটার জন্য ধাপে ধাপে যেসব জটিল ফর্ম পূরণ করতে হতো, তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। আর চতুর্থ সুবিধাটি হল, যাত্রীদের নাম এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য এবার থেকে আইআরসিটিসি-র এই নতুন ওয়েবসাইটে নিরাপদভাবে সেভ করে রাখা যাবে।
| পুরনো ওয়েবসাইট | নতুন বিটা সংস্করণ |
|---|---|
| অপ্রয়োজনীয় ক্যাপচা এবং পপ-আপ বিজ্ঞাপনের বাড়াবাড়ি ছিল। | ঝঞ্ঝাটহীন ডিজাইনে কোনও অপ্রয়োজনীয় পপ-আপ বা ক্যাপচা নেই। |
| আলাদা আলাদা পেজে গিয়ে ট্রেনের ক্লাসের আসন সংখ্যা দেখতে হতো। | একই পাতায় টিকিট ফাঁকা রয়েছে কি না তা সহজে দৃশ্যমান। |
| পেমেন্ট করার সময় বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হতো ডিজিটাল পোর্টালে। | কম ধাপে অনেক দ্রুত চেকআউট এবং অনলাইন পেমেন্টের ব্যবস্থা। |
| যাত্রীদের নাম ও সম্পূর্ণ বিবরণ বারবার নতুন করে এন্ট্রি করতে হতো। | যাত্রীদের বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তী বুকিংয়ের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেভ রাখার সুবিধা। |
২০০২ সালে প্রথম এই আইআরসিটিসি ওয়েবসাইটের পথচলা শুরু হয়েছিল। দেখতে দেখতে প্রায় দুই দশকের বেশি সময় পার করে ফেলেছে ভারতের এই রেল টিকিট বুকিং ব্যবস্থা। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ১৪ লক্ষ ট্রেনের টিকিট বুক করা হয় এই প্ল্যাটফর্ম থেকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের চাপ এতটাই বেড়েছিল যে পুরনো সিস্টেম বারবার ধীরগতির হয়ে পড়ার অভিযোগ উঠছিল।
বিশেষ করে সকালের দিকে তৎকাল টিকিট বুকিংয়ের সময় এই পোর্টালে লগইন করতে কালঘাম ছুটত রেলযাত্রীদের। এছাড়াও পেজ হ্যাং করা, ওটিপি বা ক্যাপচা কোড আসতে দেরি হওয়া এবং পেমেন্ট মাঝপথে আটকে যাওয়ার মতো বহু অভিযোগ আসছিল রেল কর্তৃপক্ষের কাছে। সেই সমস্ত দীর্ঘদিনের অভিযোগকে গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখেই এই আধুনিকীকরণের কাজ শুরু করা হয়েছে।
রেল মন্ত্রকের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে পূর্বে সচল থাকা প্রধান আইআরসিটিসি ওয়েবসাইটটি এখনই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। নতুন বিটা সংস্করণের পাশাপাশি পুরনো সাইটটিও পুরোদমে চালু থাকবে। নতুন এই সংস্করণটির কারিগরি কাজ কতটা নিখুঁত হচ্ছে, তা স্বচক্ষে যাচাই করতে এবং যাত্রীদের সরাসরি প্রতিক্রিয়া নিতেই এখন বিটা মোড চালু করা হয়েছে।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ব্যবহারকারীরা ওয়েবসাইটটি স্ক্রোল করে দেখে তাদের নিজস্ব মতামত বা ফিডব্যাকের কথা সরাসরি রেলকে জানাতে পারবেন। মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহারের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে আগামী দিনে এই পোর্টালে আরও কিছু প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী সংস্করণটি বাজারে আসার আগে সিস্টেমে থাকা সব ধরনের কারিগরি ত্রুটি দূর করাই রেলের আসল লক্ষ্য।
ভারতের যাত্রী পরিবহনের মেরুদণ্ড হল রেলপথ এবং তার বড় অংশই নির্ভর করে আইআরসিটিসি-র ডিজিটাল বুকিং ব্যবস্থার ওপর। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এই আমূল পরিবর্তনের ফলে গতি আসবে দেশের কোটি কোটি মানুষের যাতায়াতে। যখন সময় অত্যন্ত মূল্যবান এবং সেকেন্ডের ফারাকে ট্রেনের কনফার্মড সিট পাওয়া বা না পাওয়া নির্ভর করে, তখন এই দ্রুত ও সাবলীল প্রযুক্তি সত্যিই বড় আরাম দেবে।
যাত্রীদের প্রোফাইল সেভ রাখার ব্যবস্থা থাকায় প্রবীণ বা নিয়মিত ভ্রমণকারী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি সুফল পাবেন। নাম, বয়স কিংবা পরিচয়পত্রের মতো তথ্য অ্যাকাউন্টে আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকায় বুকিংয়ের মূল্যবান সময় অনেকটাই বেঁচে যাবে। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে রেলের এই নতুন ডিজিটাল প্রচেষ্টা মানুষের জীবনকে আরও গতিশীল এবং ঝামেলামুক্ত করে তুলবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইআরসিটিসি-র এই অভিনব সংস্করণটি ভারতীয় রেলের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো গড়ে তোলার পথে এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও সহজ এই বুকিং সাইট সাধারণ জনগণের ট্রেন ভ্রমণের প্রস্তুতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। সরকারের এই অভিনব ও আধুনিক প্রয়াস রেলযাত্রীদের টিকিট বুকিংয়ের পুরনো সব সমস্যা চিরতরে মিটিয়ে দিতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
(Feed Source: oneindia.com)
