)
DNA testing for athletes: প্রযুক্তিটি ভারতের জন্য নতুন হতে পারে, তবে বিশ্বের অনেক দেশ ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে আসছে। এর আগে চিন এবং উজবেকিস্তান এই ধরনের পরীক্ষা চালিয়েছে। চীন তো তাদের ক্রীড়া জগতে জেনেটিক এবং ডিএনএ সিকোয়েন্সিং যুক্ত করে একটি বৈজ্ঞানিক বিপ্লব এনেছে।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: হকি জাদুকর মেজর ধ্যানচাঁদের জন্মদিনের সম্মান জানাতে প্রতি বছর ২৯ অগাস্ট জাতীয় ক্রীড়া দিবস পালন করা হয়। ১৯২৮, ১৯৩২ এবং ১৯ ৩৬ সালের অলিম্পিক খেলায় ভারতীয় হকি দলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ধ্যানচাঁদ। মেজর ধ্যানচাঁদ বলেছিলেন, একজন চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়কে চেনা যায় তাঁর একাগ্রতা ও নিষ্ঠা দিয়ে। নাম আর খ্যাতি তো অনেক পরে আসে।
এবার একজন চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড়ের পরিচয় তাঁর একাগ্রতার পাশাপাশি তাঁর ডিএনএ (DNA) দিয়েও নির্ধারিত হবে। ডিএনএ-র মাধ্যমে চ্যাম্পিয়ন খেলোয়াড় খোঁজার এই পরীক্ষা ভারতে প্রথমবার হতে চলেছে। এই পরীক্ষাটি কী, ডিএনএ-র মাধ্যমে কীভাবে খেলোয়াড়দের চ্যাম্পিয়ন করে তোলা হবে এবং এর সাহায্যে ভারত কীভাবে বিশ্বের স্পোর্টস সুপারপাওয়ার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, সেই বিজ্ঞানই জেনে নেব–
ক্রীড়াক্ষেত্রে গুজরাত সরকারের বৈপ্লবিক পদক্ষেপ
২০৩০ সালের কমনওয়েলথ গেমস এবং ভবিষ্যতের অলিম্পিক গেমসের জন্য ভারতকে প্রস্তুত করতে গুজরাত সরকার এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিয়েছে। সাধারণ খেলোয়াড়কে চ্যাম্পিয়ন করতে এবং তাঁদের পারফরম্যান্স উন্নত করতে খেলোয়াড়দের ডিএনএ পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই প্রোগ্রামের নাম রাখা হয়েছে ‘স্পোর্টস জিনোমিক্স প্রোগ্রাম’ (SPORTS GENOMICS PROGRAMME)। এছাড়াও একে ‘ডিএনএ ট্যালেন্ট হান্ট’-ও বলতে পারেন। ডিএনএ-র মাধ্যমে খেলোয়াড়দের ভেতরের লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে কীভাবে খুঁজে বের করা হবে এবং আরও ভালো করা হবে।
এই নতুন নিয়মে গুজরাত সরকার প্রতি বছর ২,০০০ জন খেলোয়াড়ের জেনেটিক অর্থাৎ ডিএনএ পরীক্ষা করাবে। এভাবে আগামী পাঁচ বছরে মোট ১০ হাজার খেলোয়াড়কে এই পরীক্ষার আওতায় আনা হবে। গুজরাত সরকার এই কাজের জন্য ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে সব খেলোয়াড়ের ডিএনএ তথ্য সংগ্রহ করে একটি ডেটাবেস তৈরি করা হচ্ছে।
খেলোয়াড়দের কেন করা হবে ডিএনএ পরীক্ষা?
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, ডিএনএ পরীক্ষা করালে লাভটা কী হবে? ডিএনএ দেখে কোনও খেলোয়াড় কীভাবে চ্যাম্পিয়ন হবেন? তার আগে জেনে রাখা দরকার, যেমন পেন ড্রাইভ, হার্ড ড্রাইভ বা মেমোরি কার্ডে তথ্য জমা রাখা হয়, ঠিক তেমনই মানুষের ডিএনএ হল পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা তথ্য জমা রাখার ব্যবস্থা। খেলোয়াড়ের শরীরের এই ডিএনএ তথ্য পড়েই বোঝা যাবে—কোন খেলায় তাঁকে নিলে ভালো হবে, তাঁর ট্রেনিং কেমন হবে, তিনি কী খাবার খাবেন আর কীভাবে ফিট থাকবেন। অর্থাৎ ডিএনএ দেখে খেলোয়াড়কে সঠিক খেলা বাছা থেকে শুরু করে ট্রেনিং এবং ডায়েটের সব সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। একজন চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলিট তৈরি করতে এই পদ্ধতি দারুণ কাজে আসতে পারে।
মানুষের শরীরে ‘ACTN 3’ নামের একটি জিন থাকে, যাকে বলা হয় ‘ধাবক জিন’। যাদের শরীরে এই জিনটি বেশি সক্রিয় থাকে, তাঁদের শরীরে ‘ফাস্ট-ট্যুইচ মাসল ফাইবার’ বেশি তৈরি হয়। এই ধরণের খেলোয়াড়রা ১০০ মিটার দৌড়, ওয়েটলিফটিং বা বক্সিংয়ের মতো খেলায় বেশ ভালো পারফর্ম করেন।
ঠিক একইভাবে শরীরে একটি ‘ACE’ জিন থাকে, যা রক্তে অক্সিজেনের চলাচল বাড়াতে সাহায্য করে। এটি ‘স্লো-ট্যুইচ মাসল ফাইবার’ তৈরি করে, যা ম্যারাথন দৌড়, সাইক্লিং বা সাঁতারের মতো দীর্ঘ সময় ধরে খেলাধুলা করার ক্ষেত্রে খুব দরকারি। শুধু তা-ই নয়, ডিএনএ পরীক্ষা করে এটাও আগে থেকে জেনে নেওয়া যায় যে, কোন খেলোয়াড়ের চোট পাওয়ার ঝুঁকি কতটা বেশি।
ডিএনএ-র থেকে খেলোয়াড়ের শরীর নিয়ে এই সব জানা গেলে, সেই বুঝে তাঁর খেলা, খাবার আর ট্রেনিং ঠিক করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ‘প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য আলাদা ডায়েট এবং আলাদা ট্রেনিং প্রোগ্রাম’ চালু করা যাবে।
চিন ও উজবেকিস্তানে আগেই হয়েছে এই কাজ
বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একজন সাধারণ খেলোয়াড়কে চ্যাম্পিয়ন করে তোলার এই অভিযান শুরু করেছে গুজরাতের ডিপার্টমেন্ট অফ সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং গুজরাত বায়োটেকনোলজি রিসার্চ সেন্টার। গুজরাত স্টেট টেনিস অ্যাসোসিয়েশনের খেলোয়াড়দের ডিএনএ নমুনা ইতোমধ্যেই সংগ্রহ করা হয়ে গিয়েছে। এরপর তিরন্দাজি, জুডো, বক্সিং এবং শুটিংয়ের খেলোয়াড়দের রক্তের নমুনা নেওয়া হবে। নমুনা নেওয়ার পর কীভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং তারপর খেলোয়াড়দের তৈরির পরবর্তী ধাপ কী হবে, সেটাও বুঝতে হবে।
এই প্রযুক্তিটি ভারতের কাছে একদম নতুন মনে হতে পারে, কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশেই ডিএনএ টেস্ট করে বহু দিন ধরে অ্যাথলিট তৈরি করা হচ্ছে। চিন এবং উজবেকিস্তান আগেই এই পরীক্ষা করে দেখেছে। চিন তো তাদের খেলার জগতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রীতিমতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বেইজিং ২০২২ উইন্টার অলিম্পিকের আগে চিন অফিসিয়ালি খেলোয়াড় বাছাই করার জন্য এই “জিনোম সিকোয়েন্সিং” ব্যবহার করা শুরু করে।
দুটি দেশেই মিলেছে দুর্দান্ত সাফল্য
এই প্রজেক্টে গতি, স্ট্যামিনা এবং শারীরিক ক্ষমতার দিক থেকে সেরা ৩০০ জন অ্যাথলিটের ডিএনএ খুব ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল। আর তার ফলও হাতেনাতে মেলে, যে চিন ২০১৪ সালের উইন্টার অলিম্পিকে ৩টি সোনা, ৪টি রুপো এবং ২টো ব্রোঞ্জ নিয়ে মোট ৯টি মেডেল পেয়েছিল, সেই চিনই ২০২২ সালের উইন্টার অলিম্পিকে ৯টি সোনা, ৪টি রুপো এবং ২টো ব্রোঞ্জ-সহ মোট ১৫টি মেডেল জিতে নেয়।
২০২১ সালের আরেকটি গবেষণায় ২২৮ জন খেলোয়াড়ের ডিএনএ নিয়ে কাজ করা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা কমবয়সী খেলোয়াড়দের ভবিষ্যতের পারফরম্যান্স আন্দাজ করার জন্য যে মডেল তৈরি করেছিলেন, তার ৭৪ শতাংশ অনুমানই একদম সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল। আর বর্তমান খেলোয়াড়দের ক্ষমতা মাপার জন্য তৈরি মডেল দুটির সাফল্য ছিল ৮৫ শতাংশ।
চিন ছাড়াও উজবেকিস্তান ২০১৪ সাল থেকেই ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়াদের ডিএনএ টেস্ট করে তাঁদের খেলার প্রতিভা বাড়ানোর কাজ করে চলেছে। এই জায়গা থেকেই প্রশ্ন ওঠে- ভারতেরও কি একদম স্কুল জীবন থেকেই এই নিয়ম চালু করা উচিত নয়? যেখানে উজবেকিস্তানের মোট জনসংখ্যার থেকে ৮ গুণ বেশি শিশু আমাদের দেশের স্কুলে পড়াশোনা করে!
ভারতে এই স্কিম কতটা কাজে আসবে
ভারতে প্রায় ২৬ কোটি শিশু স্কুলে পড়ে। এদের মধ্যে প্রায় ৬৪% শিশু স্কুলে কোনো না কোনো খেলাধুলা বা শারীরিক চর্চায় অংশ নেয়। কিন্তু দুখঃজনক বিষয় হল, তাদের মধ্যে থেকে মাত্র ১ শতাংশ শিশুই জাতীয় বা উচ্চ স্তরে কোনও খেলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যদি পুরো দেশজুড়ে খেলোয়াড়দের এই ডিএনএ টেস্ট প্রজেক্ট শুরু করা যায়, তবে ভারত খুব সহজেই বিশ্বের ক্রীড়া পরাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। এই উদ্যোগটি শুধু প্লেয়ারদের উপকার করবে না, বরং খেলাধুলা এবং দেশের ক্রীড়া অর্থনীতির জন্যও এক বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করবে।
গুগল এবং ডেলয়েটের একটি সমীক্ষা বলছে, ভারতে খেলার বাজার বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে দাঁড়াবে ১০ লাখ কোটি টাকায়। খেলার জগতের কারণে বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৭ লাখ মানুষের কাজ রয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে প্রায় ১ কোটিতে পৌঁছাবে।
মুম্বইতে খেলোয়াড়দের খেলার মাঠ কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা
ভালো খেলোয়াড় তৈরির জন্য ডিএনএ টেস্ট করাতে কোনও বাধা নেই, এটি খুব সুন্দর একটি উদ্যোগ। কিন্তু খেলার মাঠই যদি না দেওয়া যায়, তবে প্লেয়ার তৈরি করবেন কীভাবে? অ্যাথলিটদের তৈরি করার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার খেলার মাঠ। অথচ আজকে সেই খেলার মাঠই সংকটের মুখে।
মুম্বইয়ের একটি ফুটবল খেলার মাঠ ভেঙে সেখানে প্রদর্শনী কেন্দ্র বানানোর চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রদর্শনী করাটাই আসল, খেলার মাঠ বা ফুটবলার তৈরি করা নয়। এই মুহূর্তে আপনার স্ক্রিনে মুম্বইয়ের নেভিল ডি’সুজা ফুটবল গ্রাউন্ডের ছবি দেখতে পাচ্ছেন। ছবিতে কতগুলো পোস্টারও দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা আছে—SAVE PLAYGROUNDS. মুম্বইয়ের তরুণ ফুটবলাররা আজ তাঁদের প্রিয় খেলার মাঠ বাঁচানোর জন্য লড়াই করছেন।
আসল ঘটনা হল, মুম্বইয়ের পুরসভা অর্থাৎ বিএমসি (BMC) এই নেভিল ডি’সুজা গ্রাউন্ড নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাঠটি আর খেলার জন্য থাকবে না, সেখানে একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র তৈরি করা হবে। কর্তৃপক্ষের এই আদেশের বিরুদ্ধে প্লেয়াররা শুধু রাস্তায় নামেননি, আদালতের দরজাতেও কড়া নেড়েছেন। আদালত এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ দিয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর।
মাঠ বাঁচানোর জন্য প্লেয়ারদের লড়াই
বিএমসির দৃষ্টিভঙ্গি জানার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তারা ক্যামেরার সামনে কোনও বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। নেভিল ডি’সুজা গ্রাউন্ডে খেলতে আসা খেলোয়াড়রা আগে মুম্বাইয়ের কুপারেজ গ্রাউন্ডে খেলতেন। কিন্তু সেই কুপারেজ গ্রাউন্ডেও টাকার খেলা শুরু হয়ে যায়। মাঠটির দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় একটি বেসরকারি কোম্পানির হাতে। সেই কোম্পানি মাঠে খেলার জন্য ঘণ্টা প্রতি ৩ হাজার টাকা করে চার্জ বসিয়ে দেয়। একজন সাধারণ ঘরের খেলোয়াড়ের পক্ষে এক ঘণ্টার জন্য ৩ হাজার টাকা দেওয়া একেবারেই সম্ভব নয়। সেই কারণেই ফুটবলাররা নেভিল গ্রাউন্ডে খেলতে আসতেন। কিন্তু এখন এই মাঠের কপালেও দুঃখ জমেছে। বিএমসি মাঠটিকে প্রদর্শনী কেন্দ্রে বদলে দিতে চায়, আর খেলোয়াড়রা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন।
যে মাঠের নাম রাখা হয়েছে অলিম্পিকে হ্যাট্রিক করা মহান ফুটবলার নেভিল ডি’সুজার নামে, যে মাঠ থেকে রাহুল ভেকে, রেনিয়ার ফার্নান্দেজ এবং অময় রানাওয়াডের মতো বিখ্যাত সব ফুটবলার উঠে এসেছেন- সেই খেলার মাঠটিই আজ নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াইয়ে নেমেছে।
কেন্দ্রীয় সরকার গত এক বছরে খেলাধুলার উন্নতির জন্য প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে। দেশে প্রায় ৫ হাজার এমন কর্মকর্তা এবং কর্মী আছেন, যাঁদের মূল কাজ হল ক্রীড়া সংস্থাগুলির পরিচালনা ঠিক রাখা। এই মুহূর্তে দেশে ১০টির বেশি বড় বড় স্পোর্টস প্রোগ্রাম চলছে। এই সমস্ত কিছুর আসল উদ্দেশ্যই হল খেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, নতুন নতুন অ্যাথলিট তৈরি করা আর দেশের জন্য মেডেল নিয়ে আসা। কিন্তু খেলার মূল মাঠটাই যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তবে দেশের জন্য মেডেল আসবে কোথা থেকে?
(Feed Source: zeenews.com)
