IIT Kharagpur: ঘূর্ণিঝড়ে শুধু ঘরবাড়ি বা নদীবাঁধ নয়, ধ্বংস হচ্ছে মাটির অতল গভীরে থাকা মিষ্টি জলের স্তরেও! আইআইটি খড়গপুরের গবেষকদের চাঞ্চল্যকর রিপোটে প্রকাশ, আমফানের মতো ঝড়ে মাটির ১০০ মিটারেরও গভীরে ঢুকে পড়ছে সমুদ্রের নোনা জল।
আইআইটি খড়গপুরের গবেষকদের সুন্দরবন অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলস্তর ও পিজোমিটার মাধ্যমে নোনা জলের অনুপ্রবেশ পরীক্ষার কাজ (ছবিঃ এআই)
খড়গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, রঞ্জন চন্দ: উপকূলের বুকে আছড়ে পড়া তীব্র ঘূর্ণিঝড় যে কেবল মাটির উপরে ঘরবাড়ি ও নদীবাঁধের ধ্বংসলীলা চালায় তা নয়, মাটির অতল গভীরেও নিঃশব্দে ডেকে আনে মারাত্মক বিপর্যয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন আইআইটি খড়গপুরের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী আমফানের মতো ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় মাটির ১০০ মিটারেরও বেশি গভীরে থাকা মিষ্টি জলের স্তরেও সমুদ্রের নোনা জলের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে। সুন্দরবনের মতো গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপের জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চলে এই ঘটনা সাধারণ মানুষের পানীয় জলের নিরাপত্তাকে চূড়ান্ত ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। আইআইটি খড়গপুরের ভূতত্ত্ব ও ভূপদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ও গবেষক প্রকৃতি মজুমদার এবং অন্ধ্রপ্রদেশের এসআরএম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. কৌশিক দাসের যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে।
‘গ্রাউন্ডওয়াটার ভালনারেবিলিটি টু আমফান অ্যান্ড আদার রিসেন্ট সাইক্লোনস ইন আ ট্রপিক্যাল মেগা-ডেল্টা’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটিতে ২০১৭ সালের মে মাস থেকে ২০২০ সালের মে মাসের মধ্যে সুন্দরবন অঞ্চলে বয়ে যাওয়া ১১টি চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের তথ্য খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল সাতটি গভীর নিম্নচাপ এবং তিতলি, ফণি, বুলবুল ও আমফানের মতো চারটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ভূগর্ভের বিভিন্ন গভীরতায় ইন-সিটু পিজ়োমেট্রি, হাইড্রোজিয়োকেমিস্ট্রি, স্থিতিশীল আইসোটোপ বিশ্লেষণ এবং নিউমেরিক্যাল সিমুলেশন পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষকেরা ঝড়ের আগে, চলাকালীন ও পরের পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বড় মাপের ঝড় ও নিম্নচাপের প্রভাবে মাটির নিচে জলের চাপ ও হাইড্রলিক গ্রেডিয়েন্টে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, যা মিষ্টি ও নোনা জলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ভেঙে দিয়ে ১০০ মিটারের বেশি গভীরের সুরক্ষিত পানীয় জলেও সমুদ্রের জলের অবাধ মিশ্রণ ঘটিয়ে দেয়।
গবেষণার ফলাফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইআইটি খড়গপুরের অধ্যাপক অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় বলেন, “ঝড়ের দৃশ্যমান ধ্বংসলীলার বাইরেও এর মারাত্মক প্রভাব মাটির ১০০ মিটারের বেশি গভীরে পৌঁছে ভূগর্ভস্থ জলস্তর ও হাইড্রলিক ভারসাম্যে দ্রুত পরিবর্তন আনছে। ফলে গভীরের সুরক্ষিত মিষ্টি জলে সমুদ্রের নোনা জল ঢুকে পড়ার ঝুঁকি মারাত্মক রূপ নিচ্ছে, যা কোটি কোটি উপকূলবাসীর পানীয় জলের নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।” গবেষণায় স্পষ্ট দেখা গেছে, অগভীর স্তরে জলের ওঠানামা দ্রুত স্বাভাবিক হলেও গভীরের পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয়। স্থিতিশীল আইসোটোপ, বিশেষ করে ডেল্টা-১৮-ও পরিমাপের মাধ্যমে ভূগর্ভে জলের এই গতিবিধি প্রমাণিত হয়েছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপে আর্সেনিক, দূষণ ও সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির সঙ্গে এই নতুন বিপদ যুক্ত হওয়ায় বিজ্ঞানীরা সমগ্র ভূগর্ভস্থ জলস্তরকে একক ব্যবস্থা না ভেবে গভীরতা অনুযায়ী পৃথক জল ব্যবস্থাপনা নীতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই বিপদ কেবল সুন্দরবনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীল সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উপকূলীয় বদ্বীপের জন্যই এটি এক কড়া সতর্কবার্তা। আইআইটি খড়গপুরের বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভূগর্ভস্থ জলের সুরক্ষাকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অভিযোজন পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা এখন সময়ের দাবি। এর জন্য মাটির বহুস্তরীয় জল কাঠামোর উপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোর পাশাপাশি চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাসের সঙ্গে জল উত্তোলন নীতিকে সরাসরি যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গভীরের অ্যাকুইফার রক্ষা করা, ভূগর্ভস্থ জল তোলার মাত্রা সুনির্দিষ্ট ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং নোনা জলের ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে নিরাপদ দূরত্বে নলকূপ স্থাপন করাই আগামী দিনে উপকূলের মানুষের তৃষ্ণা মেটানোর একমাত্র ভরসা হয়ে উঠতে পারে।
(Feed Source: news18.com)