
এই বক্তব্যগুলি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয়—যোগাযোগ ব্যবস্থার এত নিয়ন্ত্রণ এবং বিপুল তথ্যের নাগাল কি একজন ব্যক্তি বা বেসরকারি সংস্থার হাতে থাকা উচিত? ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাস্কের হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন সরকারের বিরোধীদের প্রতি তাঁর সমর্থন এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতে Starlink-এর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একটি গবেষণাপত্র।
বিষয়টি শুধু মণিপুরে Starlink-এর টার্মিনাল উদ্ধার হওয়া কিংবা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাচারকারীদের হাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। ভারত সরকার যখন ওই যন্ত্রগুলির বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল, তখন সংস্থাটি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মণিপুরে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে Starlink-এর সরঞ্জাম উদ্ধার হওয়ার খবর সামনে আসার পর মাস্ক X-এ দাবি করেন, ভারতে Starlink-এর স্যাটেলাইট সিগন্যাল বন্ধ রয়েছে। কিন্তু গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতি আরও জটিল।
Starlink-এর লো আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইট পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি কক্ষপথে ঘোরে। ফলে প্রচলিত জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইটের তুলনায় এই ব্যবস্থার সিগন্যালকে সাধারণ পদ্ধতিতে বাধা দেওয়া কঠিন।
Starlink-এর টার্মিনালে এমন অ্যান্টেনা ব্যবহার করা হয়, যা ইলেকট্রনিকভাবে স্যাটেলাইটের দিকে সিগন্যাল পরিচালনা করতে পারে। এগুলি ক্রমাগত পরিবর্তিত অবস্থানে থাকা স্যাটেলাইটের সঙ্গে নির্দিষ্ট সংযোগ বজায় রাখে।
এই সংযোগে বাধা দিতে হলে জ্যামারকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সিগন্যাল লক্ষ্য করতে হয়। এমনকী একটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে টার্মিনাল অন্য স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট আকাশের তুলনামূলক স্থির অবস্থানে থাকলেও Starlink-এর স্যাটেলাইটগুলি বিভিন্ন কক্ষপথে চলাচল করে। তাই ধারাবাহিকভাবে সেগুলিকে লক্ষ্য করে সিগন্যাল বন্ধ করা আরও কঠিন।
উদ্বেগের আরও একটি কারণ হল ওয়াশিংটনে মাস্কের উল্লেখযোগ্য প্রভাব এবং মার্কিন মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতে SpaceX-এর কৌশলগত গুরুত্ব।
২০২৫ সালে প্রকাশ্যে মতবিরোধ হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রচারে মাস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি Department of Government Efficiency (DOGE)-এর কার্যত প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
অন্যদিকে, SpaceX মার্কিন National Reconnaissance Office এবং US Space Force-এর জন্য স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। এই স্যাটেলাইটগুলির মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহায়ক ব্যবস্থাও রয়েছে। NASA-র মানব মহাকাশ অভিযানেও SpaceX গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে মানুষের ধারাবাহিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং Artemis চন্দ্র অভিযান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সংস্থাটির ভূমিকা রয়েছে।
গবেষণাপত্রে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, মার্কিন স্বার্থের প্রয়োজনে সরকার SpaceX-কে ভারতে Starlink-এর কার্যক্রম থেকে তথ্য ভাগ করে নিতে, নির্দিষ্ট অঞ্চলে পরিষেবা চালু বা বন্ধ রাখতে কিংবা আমেরিকার স্বার্থ অনুযায়ী পদক্ষেপ করতে চাপ দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত Starlink এমন একটি বিদেশি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে, যার সিদ্ধান্তের উপর অন্য একটি দেশের সরকারের প্রভাব থাকতে পারে।
তাই উদ্বেগের বিষয় শুধু Starlink একটি বিদেশি পরিষেবা—এতটুকু নয়। কোনও সরকার বা নিরাপত্তা বাহিনী যদি জরুরি যোগাযোগের জন্য এই ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তা হলে বেসরকারি সংস্থা এবং তার মালিকের সিদ্ধান্তের কারণে সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে।
(Feed Source: news18.com)
