
ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা Starlink বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিতর্কের মুখে পড়েছে। কোথাও আদালতের নির্দেশ পালন নিয়ে আইনি সংঘাত, কোথাও যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার ও চোরাচালানের তদন্তে উঠে এসেছে এই পরিষেবার নাম। যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত টেলিযোগাযোগ পরিকাঠামোর মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ বজায় রাখতে Starlink গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই পরিষেবার ব্যবহার ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং বেসরকারি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে।
এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, কোন পাঁচটি দেশে Starlink-কে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই সংঘাতের সূত্রপাত ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশকে কেন্দ্র করে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, স্থানীয় আইনি প্রতিনিধি নিয়োগ না করায় X-এর পরিষেবা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েস পরবর্তী সময়ে এই বিরোধের মধ্যে Starlink এবং X-এর ব্রাজিলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও ফ্রিজ করার নির্দেশ দেন।
পরে অবশ্য নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে X-কে ব্লক করতে রাজি হয় Starlink। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে গেলে সংস্থাটির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এমনকি তাদের গ্রাউন্ড স্টেশনগুলিতে থাকা সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত করার বিষয়টিও সামনে এসেছিল।
পরবর্তী সময়ে সরকারের কাছে অর্থ হস্তান্তরের পর ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট অ্যাকাউন্টগুলির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে,একই ধনকুবেরের মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সংস্থার মধ্যে সম্পর্ক থাকলে, জাতীয় আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে?
তবে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে যুদ্ধক্ষেত্রে Starlink-এর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের সময় খেরসন-সহ কয়েকটি এলাকায় Starlink-এর কভারেজ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ইলন মাস্ক। দোনেৎস্কের কিছু এলাকাতেও এই পরিষেবা বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পরিষেবা বিঘ্নিত হওয়ায় সম্মুখসারিতে থাকা ইউক্রেনীয় সেনাদের যোগাযোগ, নজরদারির কাজে ব্যবহৃত ড্রোন এবং কামান পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছিল।
তবে SpaceX এই প্রতিবেদনের যথার্থতা নিয়ে আপত্তি জানায়। সংস্থার বক্তব্য ছিল, ইউক্রেনকে পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।
এই ঘটনা যুদ্ধের সময় বেসরকারি প্রযুক্তি সংস্থার উপর সামরিক বাহিনীর নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। কোনও বেসরকারি সংস্থা বা তার শীর্ষকর্তার সিদ্ধান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে।
ইউক্রেনের অভিযোগ ছিল, রুশ বাহিনী অনুমতি ছাড়া Starlink পরিষেবা ব্যবহার করছিল। দূরপাল্লার আক্রমণকারী ড্রোনে এই টার্মিনাল বসানোর ঘটনাও সামনে এসেছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
অনুমোদিত ব্যবহারকারীদের চিহ্নিত করতে SpaceX-এর সঙ্গে কাজ করছিল ইউক্রেন। এর জন্য একটি যাচাইকরণ ব্যবস্থা বা ‘হোয়াইটলিস্ট’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে ইউক্রেনে বৈধভাবে ব্যবহৃত টার্মিনালগুলিকে শনাক্ত করা যায় এবং অনুমোদনহীন ডিভাইসগুলিকে ব্লক করা সম্ভব হয়।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ জানিয়েছিলেন, অনুমোদিত তালিকায় না থাকা টার্মিনালগুলি ব্লক করা হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের ফলে রুশ সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে। যদিও এর প্রকৃত প্রভাব কতটা বিস্তৃত ছিল, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
পরবর্তী সময়ে রাশিয়ার এক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, রুশ সামরিক বাহিনীর Starlink টার্মিনালগুলি প্রায় দুই সপ্তাহ কাজ করেনি। তবে এই পরিষেবা বন্ধ হওয়ায় রুশ ড্রোন অভিযানের কার্যকারিতা কমে গিয়েছিল বলে যে দাবি উঠেছিল, তা নিয়ে তিনি আপত্তি জানান।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, আধুনিক যুদ্ধে স্যাটেলাইট যোগাযোগ কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুমোদনহীন টার্মিনাল নিষ্ক্রিয় করার মতো প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত কীভাবে সামরিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে দারফুর অঞ্চলের কিছু এলাকায়, Starlink বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। Freedom House-এর Freedom on the Net 2024 রিপোর্ট অনুযায়ী, দারফুরে Rapid Support Forces (RSF) এবং বিভিন্ন মানবিক সহায়তা সংস্থা Starlink ব্যবহার করেছিল। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, আমদানির উপর বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে চোরাপথে এই পরিষেবার টার্মিনাল সুদানে নিয়ে আসা হয়েছিল।
তবে এই পরিষেবার খরচ ছিল অনেকের নাগালের বাইরে। Freedom House-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, RSF-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য বাসিন্দাদের বেশি টাকা দিতে হত।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে Starlink ঘোষণা করে, যেসব দেশে তাদের পরিষেবার অনুমোদন নেই, সেখানকার টার্মিনালগুলির পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে। সুদানও সেই দেশগুলির মধ্যে ছিল। তা সত্ত্বেও ওই বছরের মে মাসে দারফুরে Starlink টার্মিনাল চালু থাকার খবর পাওয়া যায়।
সুদানের পরিস্থিতি স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের দ্বৈত ভূমিকা তুলে ধরে। একদিকে, এই পরিষেবা সাধারণ মানুষ ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলিকে যোগাযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে, অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, অত্যধিক খরচ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির হাতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়।
প্রথম ঘটনায়, নিরাপত্তা সংস্থাগুলি বিপুল পরিমাণ মেথামফেটামিন পাচারের সন্দেহে একটি জাহাজ আটক করে। ওই জাহাজ থেকে একটি স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ডিভাইস উদ্ধার করা হয় বলে জানা যায়। বাজেয়াপ্ত মাদকের আনুমানিক মূল্য ছিল ৪২০ কোটি নয়, প্রায় ৪২০ কোটি মার্কিন ডলার (৪.২ বিলিয়ন ডলার)।
ডিভাইসটি সম্পর্কে তথ্য জানতে Starlink-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তদন্তকারীরা ডিভাইসটি কোথা থেকে কেনা হয়েছিল, তা জানতে চান। জাহাজটির গতিপথ নির্ধারণে সরঞ্জামটি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হয়েছিল। তবে এটি ছিল তদন্তের একটি সম্ভাব্য সূত্র। Starlink নিজে চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ছিল, এমন কোনও প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্তের কথা এই বিবরণে বলা হয়নি।
দ্বিতীয় ঘটনাটি মণিপুরের। সেখানে নিরাপত্তাকর্মীরা একটি তল্লাশি অভিযানের সময় Starlink-এর লোগোযুক্ত স্যাটেলাইট ডিশ এবং রিসিভার উদ্ধার করেন। নিরাপত্তা আধিকারিকদের সন্দেহ ছিল, সরকারি বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও জঙ্গিরা ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য এই সরঞ্জাম কাজে লাগিয়ে থাকতে পারে। মায়ানমারের সঙ্গে ভারতের সীমান্তের কিছু অংশে নজরদারির সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে অনুমোদনহীন ডিভাইস দেশে ঢুকে থাকতে পারে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ভারতে এই ঘটনাগুলি স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের অনুমোদন, নিরাপত্তা এবং সীমান্তপারের সরঞ্জাম পাচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
একদিকে, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল ও বিপর্যস্ত যোগাযোগ পরিকাঠামোর মধ্যে Starlink গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পরিষেবা দিতে পারে। অন্যদিকে, অনুমোদনহীন ব্যবহার, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা এবং বেসরকারি সংস্থার সিদ্ধান্তের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
(Feed Source: news18.com)
