
বীরভূমের সুরুলের ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো এ বছর ২৯২ বছরে পা দিল। শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য, বনেদিয়ানা এবং পারিবারিক রীতির মেলবন্ধনে আজও স্বমহিমায় টিকে রয়েছে এই পুজো।
২৯২ বছরে সুরুলের ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো
বীরভূম,সৌভিক রায়: থিমের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া বনেদিয়ানা আর ঐতিহ্যের গন্ধ মাখানো শান্তিনিকেতনের সুরুলের জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো মানেই অন্য এক নস্ট্যালজিয়া। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি বীরভূমের বোলপুরের সুরুল সরকার বাড়ির পুজোর সেই প্রাচীন জৌলুস ও রেওয়াজ। এ বছর ২৯২ বছরে পা দিল এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির দুর্গাপুজো। বৃহৎ সুসজ্জিত অট্টালিকা, সুবিশাল থাম, সিংহদুয়ার আর শতাব্দী প্রাচীন বনেদিয়ানার ছোঁয়া সব মিলিয়ে পুজোর কদিন মেতে ওঠে গোটা সুরুল গ্রাম।
বাড়ির সদস্যদের তরফ থেকে জানা যায় বর্ধমান জেলার ছোট নীলপুর গ্রাম থেকে বীরভূমের সুরুল গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন ভরতচন্দ্র ঘোষ (যাঁদের ‘সরকার’ পদবি ব্রিটিশদের প্রদত্ত)। বর্ধমানের রাজার কাছে লাট কিনে শুরু হয়েছিল জমিদারিত্ব। জনশ্রুতি রয়েছে, নিঃসন্তান ভরতচন্দ্র ঘোষ গুরুদেবের নির্দেশে এই সুরুল গ্রামে থেকে শ্যামসুন্দর মন্দিরে নিত্যপুজো শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁরই পুত্র কৃষ্ণহরি সরকার জমিদার বাড়ির অন্দরে এই দুর্গোৎসবের সূচনা করেছিলেন। এরপর কেটে গেছে প্রায় তিন শতাব্দী।
আজ থেকে ১২৯ বছর আগে পরিবারে ভাইয়ে-ভাইয়ে বিবাদের জেরে সরকার বাড়ির পাশেই আরেকটি পুজোর সূচনা হয়, যা বর্তমানে ‘সুরুল ছোট বাড়ির পুজো’ নামে পরিচিত। এই জমিদার বাড়ির মূল আকর্ষণ রেড়ির তেলের ঝাড়বাতি, পুজোর কদিন বেলজিয়ামের প্রাচীন ঝাড়বাতিতে সেজে ওঠে নাটমন্দির ও দুর্গমণ্ডপ। আর বিশেষত্ব হল, এই ঝাড়বাতিগুলি বিদ্যুৎ নয়, জ্বালানো হয় রেড়ির তেলে। দেবীকে সাজাতে ব্যবহার করা হয় প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো প্রাচীন গয়না। পরিবারের সদস্যরাই এই দায়িত্ব পালন করেন।
এর পাশাপাশি এই পুজোর গুরুত্ব হচ্ছে ছাঁচে ঢালাই নয়, সুপ্রাচীন কাল থেকেই দেবীর মুখ হাতে গড়ার রেওয়াজ রয়েছে। বীরভূমের খয়রাশোলের সূত্রধর পরিবারের চার পুরুষ ধরে এই প্রতিমা তৈরি করে আসছেন। বর্তমানে সুভাষ সূত্রধর ও তাঁর পুত্র এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। এমনকী, চালচিত্রটিও নিখুঁতভাবে হাতে আঁকা হয়। বৈষ্ণব ও শাক্ত উভয় মতেই এখানে পুজো হয়। দোলায় করে ঘট ভরার প্রথা রয়েছে। পুজোর ভোগ হিসেবে অন্নভোগের প্রচলন নেই পরিবর্তে লুচি, মিষ্টান্ন ও ফল দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয় এবং গ্রামজুড়ে প্রসাদ বিতরণের রীতি রয়েছে। চালকুমড়ো, আঁখ ও ছাগ বলিদানের প্রথাও আজও প্রচলিত। সারা বছর কর্মসূত্রে পরিবারের সদস্যরা যে যেখানেই থাকুন না কেন, দুর্গাপুজোর কদিন সুরুলের এই জমিদার বাড়িতে সবাই একত্রিত হন। নাটমন্দিরে বসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও যাত্রাপালার আসর। অন্যদিকে, জমিদার বাড়ির সামনে বসা ছোট মেলা এবং সাউন্ড বক্সের ব্যবহারহীন শান্ত পরিবেশ দর্শনার্থীদের টানে প্রতি বছর। থিমের দৌরাত্ম্যে যখন চারপাশ মুখরিত, তখন প্রাচীন ঐতিহ্যের শিকড় আঁকড়ে টিকে রয়েছে সুরুলের সরকার বাড়ির এই দুর্গোৎসব।
(Feed Source: news18.com)
