Rabindranath Tagore: নোবেলজয়ী কাব্য রচিত হল যেখানে, সেখানেই শুকোচ্ছে ঘুঁটে, চরছে গোরু-ছাগল!

Rabindranath Tagore: নোবেলজয়ী কাব্য রচিত হল যেখানে, সেখানেই শুকোচ্ছে ঘুঁটে, চরছে গোরু-ছাগল!

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: দোতলা একটি বাড়ি। সেখানে এখন স্থানীয় লোকজন ঘুঁটে শুকোতে দেন। বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় গরু, ছাগল বেঁধে রাখেন। বাড়িটির ঘরগুলির অবস্থা খুবই খারাপ। কোথাও ভেঙে পড়েছে ছাদ, বারান্দার অবস্থা তথৈবচ। কোথাও ভেঙে পড়েছে দরজা-জানলা, কিছু দরজা-জানলা লোকজন খুলে নিয়েও গেছে বলে শোনা যায়। অযত্নে খসে পড়ছে পলেস্তারা, ইট খসে পড়ছে। দেয়ালের গায়ে জন্মেছে বট-পাকুড়, আগাছায় ছেয়ে গিয়েছে বাড়ির চারপাশ।

যাঁর-তাঁর বাড়ির কথা হচ্ছে না। এই যাঁর বাড়ির অবস্থা তাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাড়িটি কুষ্টিয়ার কুমারখালির শিলাইদহের। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত এই কাছারি বাড়ি ও সংলগ্ন দাতব্য চিকিৎসালয়টি বহুদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ইতিহাস বলছে, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮০৭ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালির শিলাইদহ অঞ্চলের জমিদারি কেনেন। আজকের ভেঙে-পড়া এই কাছারি বাড়িতে বসেই জমিদারির খাজনা আদায় হত। দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে অনেক পরে জমিদারির কাজকর্মে মাথা গলাতে বাধ্য হন তরুণ রবীন্দ্রনাথ এবং এসে পৌঁছন এই শিলাইদহে। ১৮৯১ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এখানে জমিদারি পরিচালনা করেন।

পূর্ববঙ্গের (তৎকালীন অখণ্ড বাংলাদেশ) সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মূলত চার যোগাযোগ-ভূমি– শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসর এবং দক্ষিণডিহি। এর মধ্যে দক্ষিণডিহি প্রথমে কবির মামারবাড়ি, পরে ঘটনাচক্রে এটি তাঁর শ্বশুরবাড়িও।

এর মধ্যে এই শিলাইদহের সঙ্গে কবির বিশেষ যোগ। রবীন্দ্রসাহিত্যেও স্থানটির প্রভূত যোগাযোগ। কবি ১৯১৩ সালে যে সাহিত্যকর্মের জন্য নোবেল পুরস্কার পান সেই গীতাঞ্জলীর অধিকাংশ কবিতাই রচনা করেছিলেন এই শিলাইদহে। এখানে থাকা অবস্থাতেই রচনা করেন কল্পনা, ক্ষণিকা, চৈতালী, সোনারতরী, চিত্রা, জীবনস্মৃতি, পঞ্চভূতের ডায়েরি, চিরকুমারসভা, ঘরে-বাইরে, বলাকা। শোনা যায়, চোখের বালির প্রাথমিক রচনাও এখানেই শুরু হয়েছিল। এ ছাড়াও অনেক প্রবন্ধ, গান ইত্যাদি রচনা করেন। ‘পুষ্পবনে পুষ্প নাহি, আছে অন্তরে’র মতো বহুশ্রুত গানও লেখা হয় এই শিলাইদহ-বাসপর্বেই।

সামগ্রিক ভাবে পূর্ববঙ্গ-বাস ও পূর্ববঙ্গের নানা অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর কাব্যে-সাহিত্যে নয়, তাঁর কাজেও প্রভাব ফেলেছিল। এখান থেকে নানা নতুন চিন্তা তাঁর মাথায় এসেছে। পল্লি পুনর্গঠনের বিষয়ে ভেবেছেন, সমবায়ের কথা ভেবেছেন, যন্ত্র দিয়ে কৃষিকর্মের কথা ভেবেছেন। তাঁতশিল্পের উন্নতির উদ্দেশ্যে এই কুষ্টিয়ায় বয়নবিদ্যালয়ও স্থাপন করেছিলেন। কৃষকদের মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করবেন বলে পতিসরে কৃষিব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৮ সাল থেকেই কবি যেহেতু স্ত্রীপুত্রকন্যা নিয়ে শিলাইদহে বাস করতে থাকেন, সেহেতু শহর থেকে দূরে ছেলেমেয়েদের বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে হয়েছিল তাঁকে। আর সেই ভাবনা থেকেই শিক্ষার নতুন আদর্শের ভাবনাও প্রবেশ করে তাঁর মাথায়, যার ফলশ্রুতি শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়।

তিরিশ বছর বয়সে জমিদারি দেখতে এসে দশটি বছর পূর্ববঙ্গে কাটিয়ে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এরই মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ সংকল্প করেছিলেন, জমিদারি আর এজমালি রাখবেন না। ভবিষ্যতে বিষয়সম্পত্তি নিয়ে গোলযোগ এড়াতে তিনি বেঁচে থাকতেই ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দেবেন। সেই মতো পতিসর পড়ে রবীন্দ্রনাথের ভাগে। জমিদারির কাজে বা আরও নানা কাজে পরিণত বয়সেও পতিসরে তিনি এসেছেন।

কিন্তু যে-মানুষটির এহেন যোগাযোগ জায়গাটির সঙ্গে, যে-জায়গার আকাশ-বাতাসের সঙ্গে এত আবেগ ও সৃষ্টিশীলতার স্পন্দন জড়িয়ে সেখানে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত একটি বাড়ির আজ এই অবস্থা কেন? স্থানীয় মহল মনে করে, ঠিকমতো সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে এই কাছারি বাড়িটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে। তাঁদের অভিযোগ, প্রত্নতত্ত্ব দফতর ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ হিসেবে বাড়িটি অধিগ্রহণ করেছে মাত্র। কিন্তু তারা শুধু নোটিশ টাঙিয়েই দায় সেরেছে। তাদের নোটিশ কেউ গ্রাহ্য করছে না। এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব দফতরের খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক জানিয়েছেন, শিলাইদহ কাছারি বাড়ি ও দাতব্য চিকিৎসালয় সংরক্ষণে তাঁরা কাজ করছেন। বাড়িটির মূল ভবনের কয়েকটি ঘর ও বারান্দার ছাদ ভেঙেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের বরাদ্দ দিয়ে তা সংস্কারের পাশাপাশি অন্যান্য কাজও করা হবে। এবং পর্যায়ক্রমে পুরো ভবনটিকেই আগের রূপে ফিরিয়ে আনা হবে।

(Feed Source: zeenews.com)