
নয়াদিল্লি: সন্ত্রাসে মদত দেওযার মতো গুরুতর অভিযোগ একদিকে। অন্য দিকে আবার ভারতের সঙ্গে সংঘাতের আবহ। আর সেই আবহে পাকিস্তানের রক্তচাপ বাড়িয়ে তুলছে বালুচিস্তান। বিচ্ছিন্নতাকামী নাগরিকদের একাংশ ইতিমধ্যেই স্বাধীনতাপ্রাপ্তির ঘোষণা করে দিয়েছেন। স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি পাওয়ার আর্জি জানাচ্ছেন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে। বালুচিস্তানে যে সবকিছু ঠিক নেই, তা টের পাওয়া যাচ্ছিল বেশ কিছু দিন থেকেই। দিনের আলো ফুরনোর পর এই মুহূর্তে পাকিস্তানি সেনা পর্যন্ত সেখানে ঢুকতে পারছে না বলে খবর। পরিস্থিতি এত তেতে ওঠার আরও একটি কারণ হল, বিচ্ছিন্নতাকামী নেতা-নেত্রীদের ব্যাপক ধরপাকড় করে জেলে ঢোকানো, যার মধ্যে অন্যতম মুখ হলেন মাহরাং বালোচ। (Mahrang Baloch)
পাকিস্তানের হাত থেকে স্বাধীনতার দাবি নিয়ে গত কয়েক মাসে গর্জে উঠেছে বালুচিস্তান। একদিকে বিচ্ছিন্নতাকামী সংগঠনগুলি পাক সরকার ও সেনার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে, পাশাপাশি, পাকিস্তানি সেনার বিরুদ্ধে চলছে সশস্ত্র সংগ্রামও। আস্ত ট্রেন হাইজ্যাক থেকে সেনার কনভয় উড়িয়ে দেওয়া, বাদ নেই কিছুই। সম্প্রতি মাহরাং-সহ বেশ কিছু বিচ্ছিন্নতাকামী নেতানেত্রী ও মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেফতারিতে সেই আগুনে ঘি ঢালে। এই মুহূর্তে পাকিস্তান সরকার ও সেনার বিরুদ্ধে ফুঁসছেন বালুচিস্তান নিবাসীরা। (Balochistan News)
মাহরাংকে গ্রেফতার করলে বালোচদের আন্দোলনের ঝাঁঝ থিতিয়ে আসবে বলে মনে করেছিল পাক সরকার। কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মাহরাংয়ের মুক্তির দাবিতে ইতিমধ্যেই নাগরিক সমাজ থেকে চিঠি গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কাছে। বালোচ মানবাধিকার সংগঠনও মাহরাংয়ের গ্রেফতারির তীব্র নিন্দা করেছে। Free Balochistan Movement-এর নেতা মির ইয়ার বালোচ সোশ্য়াল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘আমাদের সাহসী বোন মাহরাং বালোচ, বিবো বালোচ, গুলজাদি বালোচ এবং শত শত বালোচ মহিলা সমাজকর্মীরা পাকিস্তানের টর্চার সেলে বন্দি রয়েছেন কারণ তাঁরা নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হয়েছিলেন’।
Read the reflections of world renowned woman human rights defender Dr Mahrang Baloch in the 2024/25 Global Analysis.
Reflecting on both her own experiences as a Baloch WHRD, as well as the experiences of HRDs globally, she provides inspiring and sobering perspectives on the… pic.twitter.com/1ro3QPBMb0
— Front Line Defenders (@FrontLineHRD) May 6, 2025
৩২ বছর বয়সি মাহরাং পেশায় চিকিৎসক তথা মানবাধিকার কর্মী। কোয়েট্টার বোলান মেডিক্যাল কলেজ থেকে MBBS ডিগ্রি অর্জন করেন। মাহরাংয়ের বাবা আবদুল গফ্ফর লাঙ্গোভও মানবাধিকার কর্মী। বালোচদের উপর পাক সেনার অত্যাচারের বিরুদ্ধে বরাবর প্রতিবাদ করে আসছেন। ২০০৯ সালের ১২ ডিসেম্বর আবদুলকে পাকসেনা অপহরণ করে বলে অভিযোগ। ১৬ বছর বয়সি মাহরাং সেই সময়ই আন্দোলনে শামিল হন। সেযাত্রায় আবদুলকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, ২০১১ সালের জুলাই মাসে ফের তাঁকে অপহরণ করা হয়। দ্বিতীয় বার আর বাবাকে জীবিত ফিরে পাননি মাহরাং। ২০১১ সালের জুলাই মাসের এক রাতে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়। শরীরে গুলির ক্ষত, ও অজস্র আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানা যায়। আবদুলের উপর নৃশংস অত্যাচার চালানো হয় বলেই অভিযোগ। যে জামাকাপড় পরা অবস্থায় তাঁকে অপহর করা হয়, মৃত শরীরে সেটিই চাপানো ছিল।
২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে মাহরাংয়ের ভাইকেও অপহরণ করা হয়। আর সেই ঘটনাই বালুচিস্তান আন্দোলনের মুখ করে তোলে মাহরাংকে। সেই সময় যাঁরা সংবাদমাধ্যমে কথা বলার সাহসও পেতেন না, তাঁদের অনুপ্রেরণা জোগাতে নিজে সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা শুরু করেন মাহরাং। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বালুচিস্তানকে লুঠ করলেও, বালোচদের উপর পাকিস্তান ও তাদের সেনা অকথ্য অত্যাচার, গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে বলে সরব হন তিনি। ২০২০ সালে বোলান মেডিক্যাল কলেজে প্রত্যন্ত এলাকার পড়ুয়াদের জন্য সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে অনশনে বসেন মাহরাং, পরে সেই নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় পাক সরকার। পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও মাহরাংয়ের পাশে দাঁড়ান সেই সময়। নোবেলজয়ী মালালা ইউসফজাইও মাহরাংয়ের হয়ে মুখ খোলেন।
২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক Time ম্যাগাজিন মাহরাংকে নবীন প্রভাবশালী ১০০ জনের মধ্যে মাহরাংকে তুলে ধরে। কিন্তু সেই অনুষ্ঠানে পর্যন্ত অংশ নিতে দেওয়া হয়নি মাহরাংকে। জিন্না আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরে তাঁকে হেনস্থাও করা হয় বলে অভিযোগ। তাঁর ফোন, পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি, তাঁকে অপহরনের চেষ্টা হয় বলেও অভিযোগ করেন মাহরাং। মাহরাংয়ের আইনজীবী জানান, সন্ত্রাস, আর্থিক তছরুপ এবং জালিয়াতি মামলায় যুক্ত কুখ্যাত লোকজনের তালিকায় মাহরাংয়ের নাম যুক্ত করে পাক সরকার। পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশনের সদস্য থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার রক্ষা বিভাগের প্রতিনিধিও সেই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। পরে মাহরাংয়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের মামলাও দায়ের করা হয়। গত ২২ মার্চ কোয়েট্টায় ধর্নায় বসেছিলেন মাহরাং। সেখান থেকে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। হিংসায় উস্কানি জোগানোর অভিযোগ তোলা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
জেল থেকে পরিবারকে সম্প্রতি যে চিঠি পাঠান মাহরাং, তাতে তিনি লেখেন, ‘বালোচ অধিকারের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে বাবাই আমাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে গিয়েছেন। ওঁর পর, আমরা সেই দর্শনকে আপন করে নিয়েছি, এই সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছি’। অনুগামীদের কথায়, ‘রাষ্ট্রীয় শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ থেকে জন্ম মাহরাংয়ের’। ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মাহরাংয়ের নামে মনোনয়ন জমা পড়ে। কিন্তু এখনও বন্দিদশায় দিন কাটছে তাঁর। Voice for Baloch Missing Persons সংঠগনের পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সাল থেকে বালুচিস্তান থেকে প্রায় ১৮০০০ মানুষকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
(Feed Source: abplive.com)
