
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: গত কয়েক বছরে ভারতের প্রতিবেশী ৩ দেশে একই ছবি। আর্থিক সমস্যা, রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি থেকে জনবিক্ষোভ। ক্ষমতার দরবদল। একে একে সরতে হয়েছে পাকিস্তানে ইমরান খান, শ্রীলঙ্কায় গোতাবায়া রাজাপক্ষ, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা এবং সর্বশেষে কে পি শর্মা ওলিকে। নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার পরই রাস্তায় নেমে এসে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, পার্লামেন্টে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে লোকজন। চাপে পড়ে ইস্তফা দিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। শোনা যাচ্ছে তিনি দুবাই চলে যেতে পারেন।
নেপালের জেন জি-র বিক্ষোভে প্রাণ গিয়েছে ১৯ জনের। আহত ৪০০ জন। বিক্ষোভ ছড়িয়েছে গোটা নোপালজুড়ে। এখানেই প্রশ্ন, শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষিদ্ধ করতেই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন মানুষজন? তার জন্য এত প্রাণহানি? নাকি নেপাল হয়ে উঠল আমেরিকা আর চিনের ছায়াযুদ্ধের ক্ষেত্র?
কেন এই তত্ব জোরাল হচ্ছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান তুলে নেওয়ার পরও রাস্তায় ভাংচুর চালিয়েছে সাধারণ মানুষ। তাদের মুখে স্লোগান, চোর ওলিকে দেশ ছাড়তে হবে। দেশের তেলমন্ত্রীর ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। কাঠমান্ডুর হিলটন হোটলে আগুন দেওয়া হয়েছে। ওই হোটেলের মালিক শাসকদলের এক নেতা।
গত বছর বাংলাদেশে ও ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। বিক্ষুব্ধ জনতা শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রপতির বাসভবনে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছিল। ভবনের সুইমিং পুলে সাঁতার কেটে, রাষ্ট্রপতির বাসভবন তছনছ করে তোলপাড় করেছিল। বাংলাদেশেও বিক্ষুব্ধ জনতা শেখ হাসিনার বাসভবনে ঢুকে তুলকালাম করে। রান্ন ঘরে থেকে ফ্রিজ খুলে খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে যার যা মন চায় সেটাই করেছিল বিক্ষোভকারীরা। শেখ হাসিনা ও গোতাবায়া দেশ ছেড়েছিলেন। বন্দি হয়েছেন ইমরান খান।
নেপালের ঘটনার পেছনে কি বিদেশি হাত?
গত কয়েকমাস ধরে ফুঁসছে নেপাল। ২০০৮ সালে নেপাল হিন্দু রাষ্ট্র থেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তার পর থেকে কে পি শর্মা ওলি, পুস্প কুমার দাহাল ও শের বাহাদুর দৌবার মধ্যে ক্ষমতা বদল হতে থাকে। ওলি চিনপন্থী। ওই ৩ নেতার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে বারেবারে। তাতেই নেপালের রাজনৈতিক কাঠামোর ঘূণধরা চেহারাটা বেরিয়ে পড়ে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল দেশের আর্থিক দুরাবস্থা ও কাজের অভাবে। কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে রোজ নেপাল থেকে কাজের সন্ধানে বিদেশ যান ৫ হাজার মানুষ।
‘নেপো কিড’ প্রচার
গত ৪ সেপ্টেম্বর নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। তার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় চালু হয়ে যায় ‘নেপো কিড’ নামে এক প্রচার। সেখানে তুলে ধরা হয়ে দেশের করুণ আর্থিক অবস্থায় মধ্যেও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের সন্তানরা কীভাবে বিলাসবহুল জীবন যাপন করে চলেছে। গত ১৭ বছরে মোট ১৪টি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। গত বছরই দেশে রাজতন্ত্র ফেরানোর লক্ষ্যে একটি বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। অনেকেরই বক্তব্য নেপালকে ধর্ম নিরেপক্ষ দেশ করার চেষ্টা বৃথা হয়ে গিয়েছে।
চিনপন্থী ওলি
গত কয়েক বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী ওলি চিনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্ত করার চেষ্টা করেছেন। ভারতকে তিনি খানিকটা পাশেই সরিয়ে রেখেছিলেন। গত বছর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ওলি প্রথমে চিন সফরে যান। অতীতে দেখা গিয়েছে, নেপালে যিনি প্রধানমন্ত্রী হন তিনি প্রথমেই আসেন ভারতে। ওলি চিনের সঙ্গে একটি চুক্তি করেন। চিনের কাছ থেকে তিনি ৪১ মিলিয়ন ডলার সাহায্য নিয়ে আসেন বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য। এটাই চেয়েছিল চিন। শ্রীলঙ্কাকেও তারা এভাবেই পকেটে পুরেছে।
আমেরিকা
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় চিনের প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে বরাবরই চিন্তিত আমেরিকা। এবছরের প্রথম দিকে আমেরিকা নেপালকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার কথা বলে। এনিয়ে চিনের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয় নেপালের। এর পাশাপাশি চিনের ভিক্ট্রি প্যারেডে অংশ নেন ওলি। এতেই আমেরিকা বিরোধী হয়ে ওঠে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে। এখান থেকেই কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ অনুমান করছেন নেপালের এই বিক্ষোভের পেছনে আমেরিকার হাত থাকতে পারে। নেপালে যে বিক্ষোভ তাতে একটি জিনিস স্পষ্ট যে সেখানে রাজতন্ত্র ফিরতে চলেছে। নেপালের রাজবংশ আমেরিকার সমর্থক। সরছেন চিনপন্থী ওলি। এর ফলে কিছুটা হলেও চাপ তৈরি হল ভারতের উপরে।
(Feed Source: zeenews.com)
