আড়াল করে রেখেছিল প্রকাণ্ড সিস্ট, জরায়ু পুরো ফাঁকা, তলপেটেই বাড়ছিল ভ্রূণ, জন্মাল ‘মিরাকল শিশু’

আড়াল করে রেখেছিল প্রকাণ্ড সিস্ট, জরায়ু পুরো ফাঁকা, তলপেটেই বাড়ছিল ভ্রূণ, জন্মাল ‘মিরাকল শিশু’
নয়াদিল্লি: মায়ের জরায়ুর বাইরেই একটু একটু করে বেড়ে উঠছিল। বড় আকারের সিস্ট একেবারে ঢেকে দিয়েছিল তাকে। তাই গর্ভাবস্থার কথা টেরই পাওয়া যায়নি বেশ কয়েক মাস। যখন জানা গেল, একেবারেই আশাবাদী ছিলেন না কেউ। কিন্তু সব ভাবনাচিন্তার অবসান ঘটিয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিল ‘মিরাকল শিশু’। চিকিৎসকরা বলছেন, পৃথিবীর আলো দেখার কথাই ছিল না তার। কিন্তু বিজ্ঞানকেও হার মানিয়ে পৃথিবীতে ওই শিশুর আগমন ঘটেছে। (Abdominal Ectopic Pregnancy)

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার বেকার্সফিল্ড থেকে বিরল এক ঘটনা সামনে এসেছে। পেশায় নার্স, ৪১ বছর বয়সি সুজ় লোপেজের ডিম্বাশয়ে সিস্ট হয়েছিল। বাড়তে বাড়তে সেই সিস্টের ওজন হয় ২২ পাউন্ড, অর্থাৎ প্রায় ১০ কেজি। অস্ত্রোপচার করে ওই সিস্ট বের করার কথা ছিল। নিয়ম মতো অস্ত্রোপচারের আগে প্রেগন্যান্সি করাতে হয় সুজ়-কে। সেই প্রেগন্যান্সি টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসতেই চমকে ওঠেন সকলে। (Medical Science News)

সুজ় জানিয়েছেন, প্রথম সন্তান হওয়ার পর দ্বিতীয় বার আর সন্তান আসছিল না তাঁর। চেষ্টা করতে করতে ১৭ বছর পেরিয়ে যায়। কয়েক বছর আগে ডিম্বাশয়ে সিস্ট ধরা পড়ে, যা বাড়তে বাড়তে অত বড় আকার ধারণ করে।  তাই প্রেগন্যান্সি রিপোর্ট দেখে প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। ফলস পজিটিভ হতে পারে বলেও ধারণা জন্মায়। কিন্তু পরে দেখা যায় সত্যিই গর্ভবতী তিনি। তড়িঘড়ি স্বামী অ্যান্ড্রুকে সুখবর দেন সুজ়। একসঙ্গে নৈশভোজ সারতে গিয়ে হঠাৎই তলপেটে ব্যথা শুরু হয় তাঁর। এর পরই আসল কথা জানতে পারেন।

সিডার্স-সিনাই টারজানা মেডিক্যাল সেন্টারে নিয়ে গেলে ডাক্তারি পরীক্ষা হয় সুজ়ের। দেখা যায়, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে তাঁর। এর পর MRI, আলট্রাসাউন্ড, ব্লাডওয়র্ক হলে বিরল ‘অ্যাবডোমিনাল একটোপিক প্রেগন্যান্সি’ ধরা পড়ে সুজ়ের। দেখা যায়, সুজ়ের জরায়ু একেবারে ফাঁকা। ডিম্বাশয়ের বৃহদাকার সিস্ট একেবারে ফুলেফেঁপে উঠেছে। তার মধ্যেই তলপেটের এক জায়গায়, যকৃতের কাছাকাছি জায়গায় ভ্রূণটি রয়েছে। তার শরীরের নিম্নাংশ জরায়ুর উপর অবস্থান করছিল সেই সময়। জরায়ুর বাইরে কোনও শিশু এত বড় হয়নি আগে। তাই আশঙ্কিত হয়ে পড়েন চিকিৎসকরাও। সুজ় জানান, গর্ভাবস্থা বুঝতেই পারেননি তিনি। পিরিয়ডসও অনিয়মিত ছিল বরাবর। তাই সেভাবে গা করেননি। 

ওই অবস্থায় শিশুটির প্রাণ বাঁচাতে ৩০ জন বিশেষজ্ঞের একটি টিম গঠন করা হয়। অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারে দক্ষ শল্য চিকিৎসক, মেটারনাল-ফিটাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, গায়নোকলোজিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট, নার্স, বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত সার্জিক্যাল টেকনিশিয়ান ছিলেন ওই টিমে। প্রথমে বিরাট আকারের সিস্টটিকে তুলে ধরে শিশুটিরে বের করে আনা হয় সন্তর্পণে। তার ওজন ছিল ৩.৬ কেজি।  তড়িঘড়ি শিশুটিকে NICU-তে স্থানান্তরিত করা হয়। এর পর কেটে বাদ দেওয়া হয় সিস্টটিকে। অস্ত্রোপচার চলাকালীন প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় সুজ়ের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে জয়ী হন তিনি। অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের টিমও।

অস্ত্রোপচারের সময় হাসপাতালেই ছিলেন সুজ়ের স্বামী অ্যান্ড্রু। তিনি বলেন, “ওই গোটা সময় বাইরে থেকে শান্ত দেখাচ্ছিল আমাকে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে শুধু প্রার্থনা করে যাচ্ছিলাম আমি। এত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম…মনে হচ্ছিল স্ত্রী-সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। শেষ পর্যন্ত দু’জনই ভাল আছে। অসাধারণ এক ঘটনা।” অ্যান্ড্রু ছেলের নাম রেখেছেন Ryu, এক বাস্কেটবল খেলোয়াড়ের নামে। একেবারে সুস্থ আছে Ryu. ১৮ বছর বয়সি দিদি কাইলার চোখের মণি হয়ে উঠেছে সে। সুজ়ের বক্তব্য, “আমি মিরাকলে বিশ্বাস করি। ঈশ্বর এই উপহার দিয়েছেন আমাদের।”

এই বিরল ঘটনা নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে চলেছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ওই টিম। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ‘অ্যাবডোমিনাল একটোপিক প্রেগন্যান্সি’ অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ৩০০০০ রোগীর মধ্যে এক জনের ঘটে। এক্ষেত্রে ফার্টিলাইজেশনের পর ডিম জরায়ুর বাইরে প্রতিস্থাপিত হয়। রক্তনালী এবং মায়ের অঙ্গের উপর ভর করেই বেড়ে ওঠে ভ্রূণ। গর্ভপত্র বা প্ল্যাসেন্টা যেহেতু বেড়ে উঠতে পারে না, তাই ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের দরুণ মৃত্যুও হতে পারে রোগিণীর। তাই জরায়ুর বাইরে একেবারে পূর্ণাঙ্গ শিশুর বেড়ে ওঠার ঘটনায় শোরগোল পড়ে গিয়েছে। 

(Feed Source: abplive.com)