জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ইরানের অর্থনীতির ভিত যে শুধু তেল বা গ্যাস নয়, তা প্রমাণ করে দিয়েছে দেশটির জাতীয় রত্নভাণ্ডার। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও মূল্যবান রত্নসম্ভার হিসেবে পরিচিত ইরানের ‘ক্রাউন জুয়েলস’ বা রাজরত্নসমূহ শুধুমাত্র ঐতিহাসিক ঐতিহ্য নয়, বরং দেশের মুদ্রা রিয়ালের পেছনে এক গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ভরসাও বটে। শুধু তাই নয়, এই রত্নভান্ডারে রয়েছে ভারতের সেই প্রাচীন ইতিহাস অর্থাৎ ‘ময়ূর সিংহাসন’ যা ছিল মুঘল সম্রাট শাহজাহান নির্মিত এক অসাধারণ ও বহুমূল্যবান রত্নখচিত সিংহাসন কিন্তু ১৭৩৯ সালে ‘নাদির শাহ’ এটি লুণ্ঠন করে নিয়ে যান ইরানে তারপর থেকে এখনও ওবদি এটি ইরানের রত্নভাণ্ডারে সংরক্ষিত। তাই ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই রত্নভাণ্ডারকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে ধরে রেখেছে। এই রত্নভাণ্ডারই আসল মুদ্রার মূল্যমান রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
ইরানের রাজধানী তেহরানের ‘ট্রেজারি অফ ন্যাশনাল জুয়েলস’-এ সংরক্ষিত এই রত্নভাণ্ডারে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন হিরে, মণিমুক্তো, রাজমুকুট ও অসংখ্য মূল্যবান রত্নপাথর। এগুলির মধ্যে রয়েছে ‘দরিয়া-ই-নূর’ নামক বিশ্বের বৃহত্তম গোলাপি হিরে, যার ওজন প্রায় ১৮২ ক্যারাট। এছাড়াও রয়েছে ‘পাভন পাথর’ নামক এক বিশাল পান্না, যার গায়ে খোদাই করা রয়েছে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নাম।
এই রত্নভাণ্ডারের আনুমানিক মূল্য ২০ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে হলেও, এগুলি কোনও বীমা সংস্থার আওতায় নেই এবং কখনওই বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হয়নি। বরং এগুলি একটি প্রতীকী ও বাস্তব আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই রত্নগুলিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে ধরে রেখেছে এবং এগুলির উপর ভিত্তি করেই রিয়াল মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে।
এই রত্নভাণ্ডার সাধারণত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়, তবে বিশেষ অনুমতি নিয়ে গবেষক ও পর্যটকরা এটি পরিদর্শন করতে পারেন। তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই রত্নাগার একাধারে ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতির এক অনন্য সংমিশ্রণ।
ইরানের ইতিহাসে রাজরত্নের গুরুত্ব নতুন নয়। পারস্য সাম্রাজ্যের যুগ থেকে শুরু করে কাজার ও পাহলভি রাজবংশ পর্যন্ত এই রত্নগুলি ছিল ক্ষমতার প্রতীক। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই রত্নগুলি রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষিত হয় এবং ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রত্নভাণ্ডার শুধুমাত্র একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়, বরং এটি ইরানের অর্থনীতির এক বিকল্প স্তম্ভ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে এই রত্নভাণ্ডার ইরানকে একটি আর্থিক সুরক্ষা বলয় প্রদান করে।
বিশ্বের আর কোনও দেশ এমনভাবে রাজরত্নকে রাষ্ট্রীয় মুদ্রার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে না। এই দৃষ্টান্ত ইরানকে এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির পাঠে এটি এক অভিনব অধ্যায়, যেখানে ইতিহাস ও ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে বর্তমানের আর্থিক অস্ত্র।
তেহরানের এই রত্নভাণ্ডার যেন এক নিঃশব্দ পাহারাদার, যে অতীতের গৌরবকে আগামীর আর্থিক স্থিতিশীলতায় রূপান্তরিত করছে। ইরানের মুদ্রা রিয়াল যখন বিশ্ববাজারে চাপে পড়ে, তখন এই রত্নভাণ্ডারই হয়ে ওঠে তার নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ। ইতিহাসের আলোয় ঝলমল করা এই রত্নগুলি তাই শুধুই অলংকার নয়, বরং এক রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
(Feed Source: zeenews.com)
