‘আজ সঙ্গীত নিয়ে যা প্রাপ্তি, এর নেপথ্যে আমার বাবা’, এক্সক্লুসিভ ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম

‘আজ সঙ্গীত নিয়ে যা প্রাপ্তি, এর নেপথ্যে আমার বাবা’, এক্সক্লুসিভ ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম
ভারতীয় ধ্রুপদী বাদ্যযন্ত্রকে বিশ্বমঞ্চে যিনি বিশেষ জায়গা করে দিয়েছেন তিনি ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম। একাধারে দক্ষ বেহালাবাদক, সুরকার, পণ্ডিত ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম কয়েক দশক ধরে ভারতীয় বেহালাকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সিম্ফনি হল, জ্যাজ উৎসব এবং পাঁচটি মহাদেশের আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।

এই অসাধারণ মিউজিকাল জার্নি নিয়ে এবিপি লাইভ এক্সক্লুসিভকে ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম বলেন কীভাবে তার বাবা এবং গুরু, লক্ষ্মীনারায়ণ সুব্রহ্মণ্যম এই পথের যাত্রাকে সহজ করে । তুলেছিলেন। তিনি বলেন, “কিন্তু আজ যা কিছু আছে – কৌশল, দৃষ্টিভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস – সবকিছুই বাবার থেকে শেখা।”

ব্যক্তিগত এবং বিস্তৃত কথোপকথনে, ডঃ সুব্রহ্মণ্যম বলেন, একাধিক সমস্যার মধ্যে দিয়ে এই লড়াই করে গিয়েছেন তিনি। সুরের এই যাত্রাপথে চড়াই উৎরাই ছিল একাধিক। আজ যদিও লক্ষ্মীনারায়ণ গ্লোবাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ভারতের অন্যতম সম্মানিত আন্তর্জাতিক সঙ্গীত উৎসব। কিন্তু এর নেপথ্যের কাহিনী খুব সহজ ছিল না।

স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে সঙ্গীতজ্ঞ বলেন তাঁর জীবনের প্রথম স্টেজ অভিজ্ঞতার কথা। ভারতে নয়, ডঃ সুব্রহ্মণ্যমর প্রথম প্রোগ্রাম ছিল শ্রীলঙ্কায়। জাফনার বিখ্যাত নাল্লুর কান্দাস্বামী মন্দিরে ছয় বছর বয়সি সুব্রহ্মণ্যম পারফর্ম করেছিলেন। তিনি স্মৃতি রোমন্থনে বলেন যে সেই দিন তিনি কতটা ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন। ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম বলেন, ‘আয়োজকরা চাননি আমি পরিবেশন করি। হাজার হাজার মানুষের একটি বিশাল উৎসব। আয়োজকরা ভেবেছিল ছয় বছরের একটি শিশু এটি নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু বাবা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।’

সেই দিনটির স্মৃতি যে আজও টাটকা তাঁর কাছে। তিনি বলেন, ‘আয়োজকদের ওই কথায় আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। ব্যর্থ হতে পারি এই ভয়ও ছিল। তখন কী বাজিয়েছিলাম আর মনে নেই। তবে এর পর সকলের হাততালি আর মন্দির কর্তৃপক্ষের কথা শুনে মনে হয়েছিল ঠিক আছে সব।’

প্রসঙ্গত, সেটি ছিল তাঁর সঙ্গীতের যাত্রাপথের শুভ সূচনা। এরপর বিশ্বাস, শৃঙ্খলার উপর ভরসা করে এগিয়ে চলেছেন তিনি। ১৯৫৮ সালের ভারত-বিরোধী দাঙ্গার সময় শ্রীলঙ্কা থেকে চলে এসেছিলেন তাঁরা। সুব্রহ্মণ্যমের কথায়, ‘রাতারাতি পালিয়ে যেতে বাধ্য হই কিছুই না নিয়ে ভারতে ফিরে আসেন। আমার বাবা সবকিছু হারিয়েছিলে। শূন্য থেকে শুরু করে করেছিলেন তিনি।’

ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম বলেন, ‘কর্ণাটক সঙ্গীতে বেহালার ভূমিকা পুনর্গঠন শুরু করার দিকে মনোনিবেধ করেছিলাম।  এটিকে একটি একক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে কল্পনা করা হয় পশ্চিমী ধারণা থেকে। বেহালাকে মূলত একটি সহায়ক বাদ্যযন্ত্র হিসেবে দেখা হত। কিন্তু বাবা সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠন করেছিলেন যাতে এটি বিশ্ব মঞ্চে স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়াতে পারে।’ ধীরে ধীরে ভারতীয় বেহালার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করেন এই সুব্রহ্মণ্যম পরিবার।

সঙ্গীতের প্রতি তার প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও, ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যম এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। সেই সময় তাঁকে এমনটাও শুনতে হয়েছে যে, ইতিমধ্যেই সঙ্গীতের জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার জিতেছেন তিনি, তাহলে কেন এভাবে মেডিকেলের সিট নষ্ট করছেন তিনি।

ডঃ সুব্রহ্মণ্যমর কথায়, এই সিদ্ধান্তটি পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল ছিল, আবেগের উপরও নির্ভরশীল ছিল। তাঁর কথায়, “আমরা আর্থিকভাবে কষ্টে ছিলাম। আমি বিজ্ঞান ভালোবাসতাম এবং ডাক্তার হলে সেই আর্থিক কষ্ট কমত। এমনকি যখন জার্মানিতে সঙ্গীত নিয়ে পড়াশোনার জন্য বৃত্তি আসে, তখনও মা জোর করেন প্রথমে চিকিৎসাবিদ্যাই শেষ করতে হবে। এটা ছিল আমার জীবনের সেরা উপদেশ “ওই এমবিবিএস ডিগ্রি না থাকলে, আমি পরবর্তীতে সঙ্গীতে পিএইচডি এবং ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করতে পারতাম না।”

ডঃ এল. সুব্রহ্মণ্যমের বিশ্বব্যাপী সাফল্য আসে যখন তিনি ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতকে পশ্চিমা অর্কেস্ট্রেশনের সঙ্গে মিলিয়ে এক অনবদ্য সুর মিশেল পরিবেশন করতে শুরু করেন। যদিও সেই সময় এ ধরনের কাজকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সন্দেহের চোখে দেখা হত। তবে “ফ্যান্টাসি উইদাউট লিমিটস” এবং “কনভারসেস” – জ্যাজ কিংবদন্তি স্টিফেন গ্র্যাপেলির অ্যালবামগুলি আন্তর্জাতিক প্রশংসা অর্জন করে, তাকে হার্বি হ্যানকক এবং মাইলস ডেভিসের মতো আইকনদের সঙ্গে একই সারিতে দাঁড় করানো হয়। পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকেও একাধিকবার প্রশংসা অর্জন করেছিলেন এই কিংবদন্তী।

(Feed Source: abplive.com)