জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: আহমদাবাদের অভিজাত বোডাকদেব এলাকায় অবস্থিত এনআরআই টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাট থেকে বুধবার রাতে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা তথা রাজ্যসভা সাংসদ শক্তি সিং গোহিলের ভাইপো যশরাজ সিং গোহিল (৩৫) এবং তাঁর স্ত্রী রাজেশ্বরী গোহিল (৩০)-এর রহস্যজনক মৃত্যুতে গোটা শহর স্তব্ধ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিসের ধারণা, নিজের লাইসেন্স করা রিভলভার নিয়ে নাড়াচাড়া করার সময় দুর্ঘটনাবশত গুলি চলে যাওয়ায় রাজেশ্বরীর মৃত্যু হয়। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই নিজেকে গুলি করে আত্মঘাতী হন যশরাজ।
ঘটনার প্রেক্ষাপট:
যশরাজ সিং গোহিল পেশায় গুজরাট মেরিটাইম বোর্ডের (GMB) একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ছিলেন। মাত্র দুই মাস আগে রাজেশ্বরীর সাথে তাঁর বিবাহ হয়েছিল। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দম্পতি অত্যন্ত সুখী ছিলেন এবং ঘটনার পরের দিনই তাঁদের বিদেশ ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার কথা ছিল। বুধবার রাতে তাঁরা এক আত্মীয়ের বাড়িতে নৈশভোজ সেরে রাত সাড়ে ১০টা নাগাদ নিজেদের ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন। যশরাজের মা দেবায়নিবা সেই সময় অন্য একটি ঘরে ছিলেন।
অভিশপ্ত সেই রাত:
পুলিসের কাছে দেওয়া দেবায়নিবার বয়ান অনুযায়ী, যশরাজ এবং রাজেশ্বরী শোওয়ার ঘরে থাকাকালীন হঠাৎ একটি গুলির শব্দ পাওয়া যায়। যশরাজ আতঙ্কিত অবস্থায় তাঁর মায়ের ঘরে গিয়ে জানান যে, তাঁর রিভলভার থেকে দুর্ঘটনাবশত একটি গুলি চলে গেছে এবং সেটি রাজেশ্বরীর মাথার পিছনে লেগেছে। রক্তাক্ত অবস্থায় রাজেশ্বরীকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে যশরাজ নিজেই তৎক্ষণাৎ ১০৮ নম্বরে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন।
শেষ মুহূর্তের ট্র্যাজেডি:
কিছুক্ষণ পরেই অ্যাম্বুলেন্সের স্বাস্থ্যকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। পরীক্ষা করার পর তাঁরা রাজেশ্বরীকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। স্ত্রীর মৃত্যুর খবর শোনার পরেই যশরাজ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন এবং অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের ঘরের বাইরে যেতে বলেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন কন্ট্রোল রুমে খবর দেওয়ার জন্য বারান্দায় গিয়েছিলেন এবং তাঁর মা অন্য ঘরে ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই দ্বিতীয়বার গুলির শব্দ শোনা যায়। সবাই দ্রুত ঘরে ফিরে দেখেন, যশরাজ নিজের মাথায় গুলি চালিয়েছেন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
তদন্ত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
আহমদাবাদ পুলিসের এ-ডিভিশনের এসিপি জিতেন্দ্র ব্রহ্মভট্ট জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে এটিকে একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এবং তার পরবর্তী আত্মহত্যা বলে মনে করা হচ্ছে। তবে যেহেতু ঘটনাটি ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে ঘটেছে, তাই ফরেনসিক (FSL) এবং ব্যালিস্টিক বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। রিভলভারটি লাইসেন্স করা ছিল এবং পুলিস সেটি বাজেয়াপ্ত করেছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেনসিক পরীক্ষার পরই আসল সত্য স্পষ্ট হবে।
কংগ্রেসের মুখপাত্র মণীশ দোশি এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও বেদনাদায়ক’বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, যশরাজ অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং ইউপিএসসি (UPSC) পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর গাড়ির প্রতি ছিল তীব্র শখ এবং সবসময় আগ্নেয়াস্ত্র সাথে রাখার প্রবণতা ছিল, যা নিয়ে পরিবারের বড়রা মাঝেমধ্যে তাঁকে সতর্ক করতেন।
সাংসদ শক্তি সিং গোহিল বর্তমানে গভীর শোকাচ্ছন্ন। শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাজেশ্বরীর পৈতৃক গ্রাম ভাবনগরেও। মর্মান্তিক এই মৃত্যু দুটি পরিবারের স্বপ্নকে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দিল। পুলিস ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ঘটনার নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না।
এই ঘটনা আবারও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত সচেতনতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি ছোট অসাবধানতা কীভাবে দুটি প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, আহমদাবাদের এই ঘটনা তারই এক করুণ উদাহরণ হয়ে রইল।
(Feed Source: zeenews.com)
