
আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালিবান সরকার নয়া ‘ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড ফর কোর্টস’ চালু করেছে, তাতে ফৌজধারি কার্যবিধি লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেটি সামনে আসতেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। একযোগে সরব হয়েছেন মানবাধিকার সংস্থাগুলি। কারণ তালিবান সরকার দেশের মানুষকে চারটি অসম শ্রেণিতে ভাগ করেছে। আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে দাসত্বকে, যাকে ‘গোলামি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (Afghanistan Legitimises Slavery)
নয়া ফৌজদারি বিধির ৯ নং অনুচ্ছেদে আফগান সমাজকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, ধর্মগুরু (উলেমা/মোল্লা), বিশিষ্ট (আশরফ বা অভিজাত), মধ্যবিত্ত এবং নীচু শ্রেণি। এই চার শ্রেণির মধ্যে সমাজের একেবারে শীর্ষে রাখা হয়েছে ধর্মগুরুদের। এই ধর্মগুরুরা কোনও অপরাধ করলে, তাঁদের সঠিক পরামর্শ বা উপদেশ দিয়েই ছেড়ে দেওয়া হবে। দেশের বিচারব্যবস্থা ছুঁতেও পারবে না তাঁদের। অর্থাৎ আইনি রক্ষাকবচ দেওয়া হয়েছে তাঁদের। কিন্তু নীচু শ্রেণির কেউ যদি অপরাধ করেন, তাঁদের কপালে রয়েছে কারাবাস, দৈহিক শাস্তি। নয়া বিধি অনুযায়ী, অপরাধী কোন শ্রেণিতে পড়েন, সেই নিরিখেই শাস্তি নির্ধারিত হবে। মহিলাদের নীচু শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করেছে তালিবান, যাঁদের উপর কড়া বিধিনিষেধ জারি থাকবে। সমাজজীবন থেকে দূরে রাখা হচ্ছে রীতিমত। শিক্ষার অধিকার নেই, যেখানে ইচ্ছে যাওয়ার অধিকারও নেই।
অভিজাত শ্রেণির মধ্যে রাখা হয়েছে উপজাতি গোষ্ঠীর নেতা থেকে সেনা কম্যান্ডারকেও। তাঁরা অপরাধ করলে তলব করা হবে, কিন্তু জেল হবে না। মধ্যবিত্তদের কিন্তু জেলে যেতে হবে। যাঁরা একেবারে নীচু শ্রেণিতে পড়ছেন, তাঁদের সবচেয়ে কঠোর শাস্তি পেতে হবে। প্রকাশ্যে চাবুকপেটা থেকে জেল, কিছুই বাদ যাবে না। Afghan International জানিয়েছে, শারীরিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ‘হাড় ভেঙে দেওয়া’ এবং ‘চামড়া তুলে নেওয়া’ই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
দাসত্ব নিয়ে বলা হয়েছে, কোনও অপরাধের ক্ষেত্রে যদি আগে থেকে শাস্তির নিদান না থাকে, সেক্ষেত্রে অপরাধী মুক্তি পাবেন না দাস হয়ে থাকবেন, তা বিবেচনা করে হবে। ইমামদের হাতে ‘হুদুদ’ শাস্তি কার্যকর হবে। ‘তা’জির’ শাস্তি কার্যকর করবেন স্বামী অথবা প্রভু। ‘হুদুদ’ ইসলামি আইনের আওতায় পড়ে, যা ওপরওয়ালার নিদান লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়।
সমাজকর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি মানবাধিকার সংগঠন Rawadari এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। ২০২১ সালের অগাস্ট মাসে আফগানিস্তানে তালিবানের প্রত্যাবর্তন ঘটার পর থেকে নির্বাসনে রয়েছেন ওই সমাজকর্মীরা। তালিবান বিরোধীদের নিয়ে তৈরি Supreme Council of National Resistance for the Salvation of Afghanistan জানিয়েছে, সমানাধিকার, মানবিক মর্যাদা সুনিশ্চিতকরণে এবং দাসত্ব নির্মূল করার যে আন্তর্জাতিক বিধিনিয়ম রয়েছে, তা লঙ্ঘন করেছে তালিবান। মধ্যযুগীয় বর্বরতার চেয়েও খারাপ অবস্থা হতে চলেছে।
আফগানিস্তানের প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল মহম্মদ ফরিদ হামিদি সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ‘নাগরিকদের অপরাধী সাব্যস্ত করার দলিল আনা হয়েছে। মানুষকে নিকৃষ্ট বলে চিহ্নিত করা সরাসরি মানবিক মূল্যবোধের উপর আঘাত’। নয়া ফৌজবিধিতে বার বার ‘গোলাম’ শব্দটির উল্লেখ রয়েছে। স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে দাসত্ব বা ‘গোলামি’কে। এর ফলে গার্হ্যস্থ হিংসা, বিশেষ করে মহিলাদের ক্রীতদাস করে রাখার প্রবণতা বাড়বে বলে আশঙ্কা মানবাধিকার সংস্থাগুলির। গত বছরই মহিলাগের লেখা ১৪০টি বই নিষিদ্ধ করে তালিবান। মহিলাদের উপর বিধিনিষেধও আরোপ করে তারা।
আফগানিস্তানের প্রাক্তন ন্যাশনাল ডিরেক্টরেট অফ সিকিওরিটি চিফ রহমতউল্লা নাবিলের মতে ‘ধর্মের রাজনীতিকরণ হচ্ছে। আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করছে তালিবান’। আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিনিধি রিচার্ড বেনেট বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। আফগানিস্তানের মানবাধিকার সংগঠনগুলি সরাসরি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।
(Feed Source: abplive.com)
