জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ১৬ বছরের কম বয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা? আইন আনতে পারে কেন্দ্র। শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন আইন আনার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার। সূত্রের খবর, ১৬ বছরের কম বয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারির বিষয়ে সংসদে সব দলের সাংসদদের মধ্যে সর্বসম্মতি গঠনের চেষ্টা করা হবে।
যদি রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়, তবে আগামী দিনে সরকার এ বিষয়ে আইন আনতে পারে। সূত্রের দাবি, অস্ট্রেলিয়ার মতোই ভারতে ১৬ বছরের কম বয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করার ভাবনা চলছে।
কেন্দ্রীয় সরকার বর্তমানে একটি পরিকল্পনা করার কথা ভাবছে, যেখানে ১৬ বছরের কম বয়সিরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারবে না – ঠিক যেমনই অস্ট্রেলিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই বিষয়টি শুধু প্রযুক্তি বা সময়পাশের একটি দাবি নয়, বরং সমাজ, নিরাপত্তা, মনোবিজ্ঞান এবং নৈতিকতার সঙ্গে জড়িত একটি গভীর সমস্যা। এখানে আমরা সহজ বাংলায় বিস্তারিতভাবে জানবো – কেন এমন ভাবনা উঠছে, এর কারণগুলো কী, সরকারের প্রস্তাব কীভাবে কাজ করবে এবং এর সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী হতে পারে।
কেন এমন পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে?
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর সুবিধার পাশাপাশি আছে বিপদও:
মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে সোশ্যাল মিডিয়া অতিরিক্ত ব্যবহারে কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, স্বল্প আত্মসম্মান এবং ঘুমের সমস্যা বাড়ছে। বিশেষ করে ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ বা ‘শেয়ার’ ছোটদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
সাইবার বুলিং ও ট্রলিংয়ের ঝুঁকি
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিশোররা সহজেই বুলিংয়ের শিকার হতে পারে। তারা অনলাইন ট্রলদের মতামত ও নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার মতো গম্ভীর ঘটনা দেখা দিয়েছে।
অনিরাপদ কনটেন্ট ও প্রাপ্তবয়স্ক বিষয়বস্তুর প্রভাব
বয়স্কদের জন্য তৈরি কনটেন্ট কখনও কখনও অনিচ্ছাকৃতভাবে বাচ্চাদের কাছে পৌঁছায়, যা তাদের মন ও মানসিকতার ওপর ভুল প্রভাব ফেলতে পারে।
আদর্শহীন সামাজিক চাপ ও তুলনা মানসিকতা
অন্যদের জীবনের ‘ঝুলি করা ছাঁচানো’ ছবিগুলো শিশুদের মনে তুলনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার চাপ তৈরি করে, যা আত্মবিশ্বাস ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
এ কারণগুলোই মূলত তুলে ধরে সার্বিক নিরাপত্তা ও সুস্থতার কথা বিবেচনা করে ১৬ বছরের কম বয়সিদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ভাবা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদাহরণ: অস্ট্রেলিয়া
অস্ট্রেলিয়া ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, ১৬ বছরের কম বয়সিরা যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলতে চায়, তাদের পিতামাতার অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে। লক্ষ্য হলো শিশুদের অতিরিক্ত সময় প্রযুক্তির সামনে বসিয়ে রাখা নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা।
এটা কোনো সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা যাতে শিশু অননুমোদিতভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে প্রবেশ না করে। এর মাধ্যমে তারা নিরাপদ পরিবেশে, সঠিক গাইডেন্স পেয়ে ধীরে ধীরে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শিখতে পারে।
ভারতের পরিস্থিতি কেমন?
ভারতেও শিশুদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। অনেক কিশোরের হাতে স্মার্টফোন, অনলাইন অ্যাকাউন্ট, ভিডিও অ্যাপ এবং চ্যাটিং প্ল্যাটফর্ম। তবে পর্যাপ্ত গাইডেন্স বা নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই।
এই কারণেই আলোচিত হয়েছে – ১৬ বছরের কম বয়সিকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে রাখলে কি তারা আরও নিরাপদ থাকবে? কি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত? কতটা কার্যকর হবে?
সরকারের প্রস্তাবিত ব্যবস্থা কী হতে পারে?
সরকার যদি এই সিদ্ধান্ত নেয়, সেক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো থাকতে পারে:
১. পিতামাতার অনুমোদন বাধ্যতামূলক
২. কোনও কিশোর ১৬ এর নিচে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলতে চাইলে পিতামাতার অনুমোদন লাগবে।
৩. ডিজিটাল শিখন ও নিরাপত্তা শিক্ষার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা
৪. স্কুল বা অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে শিশুকে নিরাপদে ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষায় অংশ নেয়ার ব্যবস্থা।
সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্ম
১. সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলিকে শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা।
২. কন্টেন্ট ফিল্টারিং ও রিপোর্টিং সিস্টেম
৩. অনিরাপদ ও অশ্লীল কনটেন্ট থেকে শিশুদের রক্ষা করতে উন্নত ফিল্টারিং ব্যবস্থা।
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রভাব
ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বৃদ্ধি
নিয়ন্ত্রিত সময় ও নিরাপদ পরিবেশ শিশুদের জন্য আরও উপযোগী হবে।
মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি
সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ থেকে রেহাই পেলে মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমতে পারে।
পিতামাতার অংশগ্রহণ বাড়বে
পরিবারের সদস্যরা শিশুদের অনলাইন আচরণ প্রদর্শণে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে।
কিন্তু কি ব্যবসার দিকে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে?
সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমতে পারে, যা তাদের বিজ্ঞাপন ও রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে।
সমাধান সহজ নয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিকগুলো রোধ করার জন্য যথাযথ নীতি, শিক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।
ভারত যখন শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার কথা ভাবছে, তাতে মূল লক্ষ্য হলো শিশুদের নিরাপত্তা, সুস্থ মানসিক বিকাশ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক দিকগুলো শেখানো। এটা শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়—এটি একটি সমন্বিত পদক্ষেপ, যাতে পিতামাতা, সরকার এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে কাজ করবে সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য।
(Feed Source: zeenews.com)
