
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতের রূপ নিয়েছে। ইসরায়েল দাবি করেছে যে, ইরানের বন্দর আব্বাস (Bandar Abbas) এলাকায় তাদের বিমান হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর নৌবাহিনীর প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল আলি রেজা তাংসিরি নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো একটি বড় ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হামলার প্রেক্ষাপট ও আক্রমণ
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ এবং সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর ইরান যে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই হামলাটি চালায় ইসরায়েল।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) জানিয়েছে, তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বন্দর আব্বাসে তাংসিরির অবস্থানের সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিচালিত এক বিমান হামলায় তাংসিরিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বন্দর আব্বাস ইরানের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং ইরানের নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি।
কে ছিলেন আলি রেজা তাংসিরি?
আলি রেজা তাংসিরি ২০১৮ সাল থেকে আইআরজিসি-র নৌবাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি ইরানের নৌ-প্রতিরক্ষা কৌশলের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে ইসরায়েলি ও মার্কিন জাহাজগুলোর ওপর নজরদারি এবং প্রয়োজনে সেগুলোকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
তাংসিরি প্রায়শই পশ্চিমাদের হুমকি দিয়ে আসতেন যে, ইরান চাইলে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। তার মৃত্যু ইরানের সামরিক কাঠামোর জন্য, বিশেষ করে তাদের নৌ-শক্তির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব ও জ্বালানি সংকট
এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইতিপূর্বেই ব্ল্যাকরকের মতো বড় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তেলের মূল্যবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। তাংসিরির মতো একজন উচ্চপদস্থ কমান্ডারের মৃত্যু ইরানকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে, যা লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরে জাহাজের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।
যদি ইরান এর প্রতিক্রিয়ায় হরমুজ প্রণালীতে সব ধরনের চলাচল বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের অবস্থান ও মার্কিন রাজনীতি
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এই যুদ্ধের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে হামলার যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, তা নিয়ে মার্কিন জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মার্কিন প্রশাসনের বড় একটি অংশ চাইছে কূটনৈতিক পথে সমাধান, তবে ইসরায়েলের এই সরাসরি হামলা প্রমাণ করে যে যুদ্ধের মাঠ এখন আর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই।
ইসরায়েলি হাসপাতাল ও জরুরি প্রস্তুতি
অন্যদিকে ইরান থেকে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে ইসরায়েলজুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ইসরায়েলের হাসপাতালগুলো তাদের বেজমেন্ট বা ভূগর্ভস্থ এলাকাগুলোকে জরুরি আইসিইউ ইউনিটে রূপান্তরিত করছে। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আলি রেজা তাংসিরির মৃত্যু ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে কাজ করতে পারে। ইরান ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে যে তাদের কোনো নেতার রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে ইসরায়েল স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এমন যেকোনো শক্তিকে তারা নির্মূল করতে দ্বিধা করবে না।
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এবং জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ইরান এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং তা বিশ্ব অর্থনীতি ও শান্তিকে কতটা বিপন্ন করে তোলে।
(Feed Source: zeenews.com)
