)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ যে আবহ তৈরি হয়েছে, তার আঁচ এবার দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে পাকিস্তানের ওপর এসে পড়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
সম্প্রতি তেহরানে পাকিস্তানের দূতাবাসের কাছে একটি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা ও অপপ্রচারের ঝড় উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি বিতর্কিত দাবি সামনে এসেছে যে, ইসরায়েল পাকিস্তানকে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত
গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ২০২৫ থেকেই দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও কিছু নিউজ পোর্টালে দাবি করা হচ্ছে যে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রক পাকিস্তানকে উদ্দেশ্য করে বলেছে— ‘পাকিস্তান কিন্তু কাতার নয়, আমাদের ওপর হামলা বা উস্কানি দিলে তোমাদের চরম মূল্য দিতে হবে।’
প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েলের কোনও শীর্ষ পর্যায়ের নেতা বা সরকারি সূত্র থেকে এমন কোনও আক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে তৃতীয় কোনও মুসলিম পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রকে জড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর একটি অপপ্রয়াস।
পাকিস্তান ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ইতিহাস
পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। পাকিস্তান প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সব সময় সোচ্চার এবং ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। অন্যদিকে, ইসরায়েলও পাকিস্তানকে একটি বৈরি রাষ্ট্র হিসেবেই গণ্য করে, বিশেষ করে পাকিস্তানের পরমাণু সক্ষমতা এবং ইরানের সঙ্গে দেশটির ভৌগোলিক ও ধর্মীয় নৈকট্যের কারণে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর ইসরায়েলের একের পর এক ড্রোন ও বিমান হামলার পর পাকিস্তান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে। এই কূটনৈতিক অবস্থানের কারণেই সম্ভবত প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে যে, ইসরায়েল পাকিস্তানকে হুমকি দিচ্ছে।
‘পাকিস্তান কাতার নয়’
যদি কাল্পনিকভাবে এই বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করা হয়, তবে বোঝা যায় যে কাতার মধ্যপ্রাচ্যে একটি মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। হামাস, ইসরায়েল ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনার টেবিলে কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অন্যদিকে পাকিস্তান একটি বিশাল সামরিক শক্তি এবং পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ। উস্কানিমূলক এই ভুয়ো বার্তায় বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, পাকিস্তানের প্রতি ইসরায়েল কোনও নমনীয়তা দেখাবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এ ধরনের সরাসরি হুমকি পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যা কোনও রাষ্ট্রই সহজে করতে চায় না।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা
২০২৬ সালের শুরুতে ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে বড় ধরনের হামলার পর ইরান পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এই সংঘাতের রেশ ধরে তেহরানে বিদেশি দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। তেহরানে ইসরায়েলি স্বার্থ রক্ষাকারী কোনও বিল্ডিঙের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনাটি মূলত এই বড় যুদ্ধেরই অংশ, যার সঙ্গে পাকিস্তানের সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রসংঘ ও অন্যান্য বিশ্বশক্তিগুলো বারবার ইরান ও ইসরায়েলকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে। আমেরিকার জো বাইডেন প্রশাসন (বা পরবর্তী প্রশাসন) এবং রাশিয়া উভয়েই চায় না যে এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ুক।
পাকিস্তান এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের জন্য মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ভারতের জন্যও এটি একটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে পাকিস্তানের অস্থিরতা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলে।
পরিশেষে বলাই যায়, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ‘ইসরায়েলের পাকিস্তান বিরোধী হুমকি’ মূলত একটি সেনসেশনাল হেডলাইন বা ভুয়ো খবর। পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি কোনও যুদ্ধ বা বড় ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনা।
(Feed Source: zeenews.com)
