জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ঠিক ৫০ বছর আগে শেষবার মানুষ চাঁদের কাছাকাছি গিয়েছিল। ধারণা, পা রেখেছিল চাঁদের মাটিতে। তারপর থেকে মহাকাশযান গিয়েছে, রোবট গিয়েছে, কিন্তু মানুষ যায়নি। সেই সুদীর্ঘ অপেক্ষা শেষ হল এপ্রিলের প্রথম দিন। আর তার ঠিক দশ দিন পর, ১০ এপ্রিল, চার নভোচারী সুস্থ শরীরে ফিরে এলেন পৃথিবীতে।
নাসার (NASA) আর্টেমিস-২ শেষ করল তার ৯ দিনের চন্দ্র-পরিভ্রমণ অভিযান। চার জন নভোচারী নিয়ে এটি আর্টেমিস কর্মসূচির প্রথম মানববাহী ফ্লাইট এবং ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ (Apollo 17)-এর পর প্রথমবার কোনও মানুষ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে গেল।
চার চরিত্র এবং একটা মহাকাশযান
এই অভিযানের চার মুখ হলেন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান (Reid Wiseman), পাইলট ভিক্টর গ্লোভার (Victor Glover) এবং মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কক (Christina Koch) ও জেরেমি হ্যানসেন (Jeremy Hansen)। হ্যানসেন কানাডার মহাকাশ সংস্থা সিএসএ (CSA)-র নভোচারী। মহাকাশযানটির নাম দিয়েছিলেন নভোচারীরাই — ‘ইন্টেগ্রিটি’ (Integrity), অর্থাৎ সততা।
ভিক্টর গ্লোভার এমনিতেই ইতিহাস গড়া মানুষ। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (International Space Station) দীর্ঘমেয়াদে থাকা প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান নভোচারী হিসেবে রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। এবার আবার ইতিহাসের অংশ।
কতদূর গেলেন, কীভাবে গেলেন
মোট যাত্রাপথের দূরত্ব ছিল প্রায় ৬,৯৪,৪৮১ মাইল। একটা সময় চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে ইন্টেগ্রিটি ছিল মাত্র ৪,০৬৭ মাইল দূরে। সেটাই সবথেকে কাছ থেকে দেখা চাঁদ। পথটি ছিল ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টরি’ (Free-Return Trajectory)। অর্থাত্ চাঁদকে ঘুরে নিজে থেকেই পৃথিবীর দিকে ফেরার পথ, ঠিক যেমনটা অ্যাপোলো-১৩ (Apollo 13) নিয়েছিল।
ওরিয়ন (Orion) মহাকাশযানের সার্ভিস মডিউলটি সরবরাহ করেছিল ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ইএসএ (ESA)। ২০১৩ সালের এই চুক্তির ফলে নাসার কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় হয়েছিল।
৫০ বছরের পুরনো রেকর্ড গেল ভেঙে
৬ এপ্রিল, মিশনের ষষ্ঠ দিনে, আর্টেমিস-২ অভিযানের চার নভোচারী পৃথিবী থেকে ২,৪৮,৬৫৫ মাইল দূরে পৌঁছে মানব মহাকাশযাত্রার সর্বোচ্চ দূরত্বের রেকর্ড ভাঙলেন। এই রেকর্ড আগে ছিল ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩-এর।
অ্যাপোলো-১৩ পড়েছিল ভয়ংকর বিপর্যয়ের মধ্যে, ফিরে এসেছিল অলৌকিক ভাবে। সাড়ে পাঁচ দশক পর, এবার মহাকাশে গেলেন চার জন এবং ফিরলেন পরিকল্পনামতোই।
Let’s run that back. One more time… Or two?
Our crew is now safely back on Earth. Relive the historic mission, and keep an eye on our website as more images and videos keep rolling in. https://t.co/FoYXKVvve5 pic.twitter.com/svDaL8ZXpc— NASA (@NASA) April 11, 2026
চাঁদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সেই রাতটা
৬ এপ্রিলের সেই লুনার ফ্লাইবাই (Lunar Flyby) ছিল পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়ে প্রথম মানব চন্দ্র-পরিভ্রমণ। ওরিয়নের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে পাইলট ভিক্টর গ্লোভার বললেন, ‘তারা ফুটে আছে। অবিশ্বাস্য একটা দৃশ্য। চাঁদের সামনেটা সবচেয়ে অন্ধকার আর গভীর মহাকাশ পেছনে। কিছুটা নীল, কিন্তু তারাও দেখা যাচ্ছে।’
দলটি সেদিন চাঁদের দূরের পিঠের ছবি তুলল, যা আগে কখনও মানুষের চোখে এভাবে ধরা পড়েনি। একটি বিরল সূর্যগ্রহণও দেখলেন তাঁরা, চাঁদের ওপার থেকে।
আগুনের মধ্যে দিয়ে ঘরে ফেরা
১০ এপ্রিল রাতে ওরিয়ন ‘ইন্টেগ্রিটি’ ঘণ্টায় ২৪,০০০ মাইলের বেশি গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকল। মহাকাশযানের বাইরের তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ৫,০০০ ডিগ্রির বেশিতে।
সেই সময়ে ছয় মিনিটের জন্য মিশন কন্ট্রোল (Mission Control)-এর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বাড়ে উদ্বেগ। কারণ যানের চারদিকে প্লাজমা তৈরি হয়েছিল। যদিও তারপর ধাপে ধাপে প্যারাশুট খুলল। অবশেষে সান ডিয়েগো (San Diego) উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ওরিয়ন নামল ঘণ্টায় মাত্র ২০ মাইল গতিতে।
ব্ল্যাকআউট কাটার পর কমান্ডার ওয়াইজম্যান বললেন, ‘হাউস্টন, ইন্টেগ্রিটি, তোমাদের স্পষ্ট শুনতে পারছি।’ মিশন কন্ট্রোলে ফেটে পড়ল করতালির ঢেউ। জানা গেল, চার জনই সম্পূর্ণ সুস্থ।
নাসা ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর উদ্ধারদল হেলিকপ্টারে করে নভোচারীদের ইউএসএস জন পি মার্থা (USS John P. Murtha) জাহাজে নিয়ে যায়।
পরের গন্তব্য হল চাঁদের মাটি
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আর্টেমিস-৩ (Artemis III) মিশনে নভোচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে চন্দ্র ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং অনুশীলন করবেন। আর আর্টেমিস-৪ (Artemis IV)-এ ২০২৮ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে দুজন নভোচারীকে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কমান্ডার ওয়াইজম্যান ফেরার পর বললেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম পৃথিবীটা অন্তত এক মুহূর্তের জন্য থামুক। মনে করুক যে এটা একটা সুন্দর গ্রহ, মহাবিশ্বে একটি বিশেষ জায়গা। বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায়, আমাদের এই সম্পদটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। ভালোবাসতে হবে।’
৫০ বছরের অপেক্ষার পর চাঁদের পথে ঘোরা হল। এবার অপেক্ষা চাঁদের মাটিতে পা রাখার।
(Feed Source: zeenews.com)
