শুনেছি, পুজোর আগে তার গন্ধ আসে। নীল আকাশের পোস্টকার্ডে সাদা মেঘের রংতুলির গন্ধ, নারকেল ছাঁচের গন্ধ, রোদে দেওয়া পুরনো শাড়ির গন্ধ, কুমোরটুলি জুড়ে প্রতিমার গায়ের গন্ধ, আলমারির ভিতর মিলেমিশে যাওয়া ন্যাপথেলিন আর নতুন জামার গন্ধ। যদি জিজ্ঞেস করেন, ‘কেমন বল দেখি সে গন্ধ?’ আমি বলতে পারব না। বরং এলোমেলো যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেব, ‘তাহাই সত্য, যাহা রচিবে তুমি।’ আহা! সব গন্ধ কি আর ঘ্রাণে পাওয়া যায়? গন্ধ চোখেও দেখা যায়, আবার চেখেও। শুধু কি পুজো? তাই বা বলি কী করে মনো তো হয় উৎসবেরই গন্ধ আছে। খানিকটা আছে কড়া নাড়া, জানান দেওয়াও। ‘এই যে, আমি আসছি। সকলে প্রস্তুত তো?’ চৈত্রের শুরু থেকেই পাড়ায় পাড়ায় শোনা যায় ‘বাবা তারকনাথের চরণে সেবা লাগে’। ‘ভিক্ষাপাত্র’ নিয়ে বের তাঁরা। মা-কাকিমারা ঝুড়িতে ভরে দেন চাল, আলু। শিবের গাজন, চড়ক পুজো, নীলের উপোস, সংক্রান্তি, তারপরেই নববর্ষ। আমাদের পয়লা বৈশাখ।
এ বছর গরম তো পড়েছে নিদারুণ, তার ওপর আছে ভোটের উত্তাপ। ওটা এ বছরের ‘অ্যাড অন’। এই ‘দারুণ অগ্নিবাণ’ মারার পরেও গ্রীষ্ম কিন্তু ‘প্রেমিকার বড়লোক বাবা’র মতো অত নিষ্ঠুর নয়। সে সন্ধে বেলা আমাদের ‘লাভবম্বিং’ করে একটু মৃদুমন্দ বাতাস দিয়ে। ওতেই খুশি থাকতে হবে। খুশির ঝুড়িতে আরও কিছু অবিশ্যি আছে। এই যেমন চৈত্র সেল। সব দোকানের সামনেই ওই দোকানেরই আরেকটা ক্ষুদ্র সংস্করণ। ওখানে দাম কম, মান জানা নেই। তবে ভিড় ওপচানো। নতুন বিছানার চাদর, বালিশের কভার, কুশন কভার সবেতেই বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। ইংরেজি আর বাংলা নববর্ষের মধ্যে বেশ একটা পাডার দাদা টাইপের পার্থক্য আছে। যে দাদা বেপাড়ায় গিয়ে চুপ। অথচ নিজের পাড়ায় কাক-চিল ঢোকার আগেও তার অনুমতি নিতে বাধ্য। পয়লা বৈশাখ আমাদের সেই দাদা। এই দিনটা ভাই আমাদের। এই দিন বাঙালিয়ানার বাইরে কিচ্ছুটি হবে না। এদিন সকালে শুরু হবে এসো হে বৈশাখ। তারপরে নিম-হলুদ ছুঁইয়ে স্নান করে খানিকটা জিরিয়ে শুক্তো, মুগ ডাল, মাছ, কাঁচা আমের চাটনি। বুড়ো মানুষগুলোর আঁচলের গিঁট থেকে বের হওয়া খুচরো পয়সা দিয়ে নাতি-নাতনিদের বিকেলের খরচ জোগাড়। তারপর হালখাতা করতে বেরনো। এখনকার ‘মোইতো’ কে বলে বলে গোল দিতে পারে তখনকার বস্ত্রালয়ের সামনে বিলনো আমপোড়া শরবত। গায়ে ফুলছাপ জামা। উঁহু! পুজোর জামার মতো বাহুল্য কিন্তু এ জামায় নেই। এ জামা হবে সুতির। উঠোনে ছড়ানো মায়ের শাড়ির শুভ্র আঁচলের মতো স্নিগ্ধ। দোকানে দোকানে আমের পাতা আর গাঁদা ফুল। বাবার গায়ে ফতুয়া, মায়ের ছাপা শাড়ি, এ যেন নববর্ষের গায়ে লেগে থাকা ছোঁয়াচে-সুখ। মাটির খুড়ি দিয়ে ঘেরা কলাপাতার পাশে হরেক মাছ, চাটনি, মিষ্টির সমাহার। রাতে হিঙের কচুরি, ছোলার ডাল আর হালখাতার লাড্ডুতো আছেই।
ওই যে বলছিলাম, আগে আগে পায়ে পায়ে কিংবা আঁচল ধরে আসে আরও কেউ আসে। চড়ক, গাজন। এখন সে সব খানিকটা স্মৃতিতে, কিছুটা বিস্মৃতিতে। বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন ‘চড়কতলার মাঠের শেওড়াবন ও অন্যান্য জঙ্গল কাটিয়া পরিষ্কার করা হইয়াছে।’ কিন্তু হারিয়ে গিয়েছিল সেই চেনা চড়কের মেলা। হারিয়ে গিয়েছিল বাঁশি হাতে ছেলের দল। হারিয়ে গিয়েছে সন্ন্যাসীদের পিছনে ঘুর ঘুর করা ছোট অপু-দুর্গারা। পুজোর চিঠির মতো হারিয়ে গিয়েছে নববর্ষের চিঠি, হালখাতা।
“অক্ষয় মালবেরি গাছকে ঘিরে তীব্র ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ টের পাই, কখন সঙ্গীদের হাত ফসকে গেছে। প্রৌঢ় মুখের ওপর ছায়া পড়ে। নিজেকে আর মানুষ বলে মনে হয় না, প্রাণী বলে মনে হয়। নিঃশ্বাস নিই তাই বেঁচে থাকি। ভিতরে একা, সুখী না, দুঃখীও না। দশদিকে অসীম শূন্য এবং চিররহস্য।”