জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বেশ কিছুদিন দাম কমতে কমতে তলানিতে চলে যাওয়ার পর, বাজারে সোনার দামে আবার বিরাট লাফ। যে হারে হলুদ ধাতুর দাম বাড়ছে, তা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শক্তিশালী ডলারের বিপরীতে টাকার দামের ওঠানামার ফলে সোনা ও রুপো উভয় ধাতুই এখন সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (MCX) এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নতুন রেকর্ড স্পর্শ করছে।
রেকর্ড ভাঙছে সোনার দাম
গত কয়েক সেশনে সোনার দামের যে গ্রাফ দেখা গেছে, তাতে কার্যত স্তম্ভিত বাজার বিশেষজ্ঞরা। ভারতে প্রতি ১০ গ্রাম ২৪ ক্যারেট (বিশুদ্ধ) সোনার দাম ৭২,০০০ থেকে ৭৪,০০০ টাকার গণ্ডি স্পর্শ করেছে। একই সাথে গয়নার সোনা অর্থাৎ ২২ ক্যারেট সোনার দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। প্রতি ১০ গ্রাম ২২ ক্যারেট সোনার দাম এখন ৬৭,০০০ টাকার উপরে ঘোরাফেরা করছে।
আগের বছরের এই সময়ের তুলনায় সোনার দাম প্রায় ১৫-১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তাকে।
কেন বাড়ছে সোনার দাম?
সোনার দাম বাড়ার পিছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ রয়েছে যা বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে:
১. ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইতিহাস সাক্ষী আছে, যখনই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজার থেকে টাকা তুলে সোনা বা রুপোর মতো নিরাপদ সম্পদে (Safe Haven Asset) বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। এর ফলে চাহিদা বাড়ে এবং দাম বৃদ্ধি পায়।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ: ভারত, চিন এবং তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলি তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সোনার পরিমাণ বাড়াতে শুরু করেছে। বড় পরিসরে এই কেনাকাটা সোনার দামকে চাঙ্গা করে রাখছে।
৩. টাকার মানের পতন: আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার মূল্য কমলে আমদানিকৃত সোনার দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ভারত তার প্রয়োজনীয় সোনার সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করে, ফলে বৈশ্বিক দামের সামান্য হেরফের স্থানীয় বাজারে বড় প্রভাব ফেলে।
রুপোর বাজারেও আগুন
সোনার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রুপোর দাম। শিল্পক্ষেত্রে রুপোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারণে এমসিএক্স (MCX) মার্কেটে প্রতি কেজি রুপোর দাম ৮২,০০০ থেকে ৮৫,০০০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। সোলার প্যানেল তৈরি এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে রুপোর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী দিনে এর দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শহরভেদে সোনার দামের পার্থক্য
ভারতে সোনার দামে সামান্য তারতম্য দেখা যায় শহরভেদে। স্থানীয় কর এবং আমদানিকৃত সোনার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি এবং চেন্নাইয়ের দামে পার্থক্য থাকে।
কলকাতা ও মুম্বই: এখানে সাধারণত দাম প্রায় একই থাকে। গয়না তৈরির কারিগরদের সহজলভ্যতার জন্য এই দুই শহরে সোনার চাহিদা তুঙ্গে।
দিল্লি: উত্তর ভারতে বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সোনার জনপ্রিয়তা থাকায় এখানে ২৪ ক্যারেট সোনার দামে কিছুটা প্রিমিয়াম লক্ষ্য করা যায়।
চেন্নাই: দক্ষিণ ভারতে সোনার ব্যবহার ও চাহিদা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এখানে প্রায়শই অন্য শহরের তুলনায় সোনার দাম কিছুটা চড়া থাকে।
সাধারণ গ্রাহক ও অলঙ্কার শিল্পের সঙ্কট
সামনে বিয়ের মরসুম থাকলেও সোনার এই অস্বাভাবিক দাম বাড়ায় চরম সঙ্কটে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই তাঁদের পূর্বনির্ধারিত বাজেটের মধ্যে গয়না কিনতে পারছেন না। অলঙ্কার ব্যবসায়ীদের মতে, উচ্চমূল্যের কারণে সোনার বেচাকেনা ২০-৩০ শতাংশ কমে গেছে। মানুষ এখন নতুন গয়না কেনার চেয়ে পুরনো সোনা বদলে নতুন গয়না নেওয়া বা ছোট ও হালকা ওজনের গয়নার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।
বিনিয়োগকারীদের একাংশ আবার ডিজিটাল গোল্ড বা গোল্ড ইটিএফ (Gold ETF)-এর দিকে মনোনিবেশ করছেন। কারণ এতে ফিজিক্যাল সোনার মতো সংরক্ষণ বা নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে না।
দাম কি আরও বাড়বে?
বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সোনার দাম খুব শীঘ্রই কমার সম্ভাবনা কম। যদি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা না কমে এবং ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার না কমায়, তবে সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ৮০,০০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। অন্যদিকে, রুপোর দাম ১ লক্ষ টাকার মাইলফলক ছোঁয়ার দিকে এগোতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সোনা কেবল একটি অলঙ্কার নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক সুরক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। তবে সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এই আকাশছোঁয়া দাম বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যে, এই উচ্চ বাজারে এককালীন বড় বিনিয়োগ না করে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অন্যদিকে, যারা গয়না কেনার কথা ভাবছেন, তাদের ক্ষেত্রে দাম সামান্য কমার (Correction) অপেক্ষা করা ছাড়া আপাতত উপায় নেই।
(Feed Source: zeenews.com)
