Iran-Israel war: হরমুজ খুলতেই বিশ্ববাজারে বিরাট পতন তেলের দামে, হুড়মুড়িয়ে বাড়ল সেনসেক্স: পেট্রোল-ডিজেলের মূল্য কমে কত হল?

Iran-Israel war: হরমুজ খুলতেই বিশ্ববাজারে বিরাট পতন তেলের দামে, হুড়মুড়িয়ে বাড়ল সেনসেক্স: পেট্রোল-ডিজেলের মূল্য কমে কত হল?

জি ২৩ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: প্রায় ৬০ দিন চরম অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধের মেঘ কাটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আসছে বলেই শুক্র সন্ধ্যেই জানা গিয়েছে। যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা গাঢ় হতেই বিশ্ব অর্থনীতিতে তার ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য আবার খুলে দিয়েছে জানার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দামে প্রায় ১০ শতাংশের এক বিশাল পতন লক্ষ্য করা গেছে। একই সঙ্গে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা কমার খবরে মার্কিন শেয়ার বাজার ‘ওয়াল স্ট্রিট’-এ সূচকের ব্যাপক উত্থান ঘটেছে।

তেলের বাজারে ঐতিহাসিক ধস

বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বয়ে যায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইরান এই জলপথ বন্ধ করার হুমকি দেওয়ার পর থেকেই তেলের বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছিল। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

তবে লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া এবং ইরানের পক্ষ থেকে সমুদ্রপথ উন্মুক্ত করার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিত্র বদলে যায়। ব্রেন্ট ক্রুড এবং ডব্লিউটিআই (WTI)—উভয় ধরনের তেলের দামই ১০ শতাংশের মতো কমে যায়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহের দুশ্চিন্তা কেটে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পেয়েছেন। তেলের এই দাম কমে আসা উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশের জন্যই স্বস্তির খবর, কারণ এটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে।

ওয়াল স্ট্রিট উঠে দাঁড়াল

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমন শুধু তেলের বাজার নয়, বরং বিশ্ব পুঁজিবাজারেও নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ডাও জোন্স (Dow Jones), এসঅ্যান্ডপি ৫০০ (S&P 500) এবং নাসডাক (Nasdaq) সূচকগুলোর বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে।

বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় ছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় মাপের যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বের সব সরবরাহ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে এবং সুদের হার কমানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে। কিন্তু ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার পারদ নামতে শুরু করায় টেক জায়ান্ট থেকে শুরু করে বড় বড় উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে এভিয়েশন বা বিমান সংস্থা এবং লজিস্টিক কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় লাফ দেখা গেছে, কারণ জ্বালানি খরচ কমলে তাদের মুনাফা বাড়বে।

হরমুজ প্রণালী ও ভূ-রাজনীতির মোড়

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনা এবং ইরানের নমনীয় অবস্থান এই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতার কথা মাথায় রেখে এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির সম্মান রক্ষার্থেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এর আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এই পথে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছাকাছি অবস্থিত এই সরু জলপথটি বন্ধ থাকা মানেই ছিল বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা। কিন্তু বর্তমানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বন্দরগুলোতে আটকা পড়া হাজার হাজার কন্টেইনারবাহী জাহাজ তাদের গন্তব্যে রওনা হতে শুরু করেছে।

ট্রাম্পের ঘোষণা

গত বুধবার সকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, আগামী দুই সপ্তাহ ইরানের ওপর কোনো হামলা চালাবে না আমেরিকা। পাল্টাপাল্টি হিসেবে ইরানও সংঘর্ষবিরতির কথা স্বীকার করে নেয়। এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের (Brent Crude Oil) দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৫ ডলারে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ চলাকালীন এই দাম ১০৯.৭৭ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। শুধু ব্রেন্ট ক্রুড নয়, ইউএস টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুড তেলের দামও ব্যারেল প্রতি প্রায় ২০ ডলার কমেছে। শুক্রবার সকালেও প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ছিল ৯৮ ডলারের উপরে। তবে ইরানের ঘোষণার পরই এক লাফে তা  ৮৮ ডলারে নেমে আসে।

মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব

তেলের দাম ১০ শতাংশ কমে আসা মানেই হলো পরিবহন খরচ কমে আসা। ভারত, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর। জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমলে আমদানিকারক দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই প্রবণতা বজায় থাকে তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের দামও কমতে শুরু করবে।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতি ও রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর এক বিশ্লেষক বলেন, ‘বাজার সবসময় অনিশ্চয়তাকে ভয় পায়। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া মানে হলো বিশ্ব বাণিজ্যের একটি প্রধান ধমনী আবার সচল হওয়া। এর ফলে আমরা আগামী কোয়ার্টারগুলোতে আরও ভালো প্রবৃদ্ধি আশা করতে পারি।’

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ সতর্কবাণীও দিয়েছেন। তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। যদি কোনো পক্ষ আবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে, তবে তেলের দাম আবারও আকাশচুম্বী হতে পারে।

বিশ্ববাজারে টার্নিং পয়েন্ট?

হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং তেলের দামে বড় পতন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হতে পারে। বছরের শুরু থেকেই যে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের এই শান্তি প্রক্রিয়া তাকে কিছুটা হলেও দূরে ঠেলে দিয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিটের চাঙ্গা ভাব এবং তেলের বাজারে স্থিতি বিশ্বের সাধারণ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন সবার নজর থাকবে ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের দিকে, যা এই শান্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে।

(Feed Source: zeenews.com)