)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হল হরমুজ় প্রণালী। সম্প্রতি ইরান এই তেলপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা করায় বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের চাঞ্চল্য। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশ, যারা তাদের প্রয়োজনের ৮০ শতাংশের বেশি খনিজ তেল আমদানি করে, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি চরম সংকটের বার্তা বটেই। ওমান এবং ইরানের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ জলপথটি বন্ধ হলে ভারতের অপরিশোধিত তেল (Crude Oil), এলপিজি (LPG) এবং এলএনজি (LNG) সরবরাহতে বড় ধরনের বিপর্যয় আসতে চলেছে।
হরমুজ় প্রণালীর গুরুত্ব:
হরমুজ় প্রণালী পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং কাতার—এই দেশগুলো তাদের উৎপাদিত জ্বালানি এই পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে পাঠায়। প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং একটি বিশাল অংশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ভারতের আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ এই পথ দিয়েই আসে।
ভারতের অপরিশোধিত তেল (Crude Oil) সরবরাহে প্রভাব:
ভারত বর্তমানে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কিনলেও সৌদি আরব এবং ইরাক ভারতের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে রয়ে গেছে। হরমুজ় প্রণালী বন্ধ হওয়ার ফলে:
১. সরবরাহ ঘাটতি: পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেলবাহী জাহাজগুলো ভারতে পৌঁছাতে পারবে না। বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর ব্যবহার করা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এবং সময়সাপেক্ষ।
২. মূল্যবৃদ্ধি: সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতিকে বাড়িয়ে দেবে।
এলপিজি (LPG) ও এলএনজি (LNG) সংকটের আশঙ্কা:
ভারতের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের জ্বালানি (LPG) এবং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস (LNG)-র একটি বড় অংশ আসে কাতার এবং সৌদি আরব থেকে।
রান্নার গ্যাস: ভারত তার এলপিজি চাহিদার প্রায় অর্ধেক আমদানি করে। কাতার থেকে আসা এলএনজি এবং এলপিজি জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করে। এটি বন্ধ থাকলে দেশে রান্নার গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
শিল্প ও বিদ্যুৎ: ভারতের সার কারখানা এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো আমদানিকৃত এলএনজি-র ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ বিঘ্নিত হলে সার উৎপাদন ব্যাহত হবে, যার প্রভাব পড়বে কৃষিক্ষেত্রে।
অর্থনৈতিক প্রভাব:
১. মুদ্রাস্ফীতি: তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়বে, ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হু হু করে বাড়বে।
২. টাকার অবমূল্যায়ন: তেল কেনার জন্য ভারতকে বেশি পরিমাণ ডলার খরচ করতে হবে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় টাকার মান আরও পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
৩. চলতি খাতে ঘাটতি (CAD): তেলের উচ্চমূল্য ভারতের বাণিজ্য ঘাটতিকে বাড়িয়ে তুলবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে।
ভারতের রণকৌশল
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে:
তেল ভাণ্ডার (Strategic Petroleum Reserves): ভারতের বিশাখাপত্তনম, ম্যাঙ্গালোর এবং পদুরে মাটির নিচে তেলের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ভারত সেখান থেকে কয়েক সপ্তাহের চাহিদা মেটাতে পারে।
বিকল্প উৎস: রাশিয়া বা আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আমদানি বাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করা হতে পারে।
কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ: ইরান ও অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জলপথটি পুনরায় খোলার চেষ্টা করা ভারতের জন্য অপরিহার্য।
হরমুজ় প্রণালী বন্ধ হওয়া ভারতের জন্য শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, জাতীয় নিরাপত্তা সংকটও বটে। জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদী ঘাটতি ভারতের উন্নয়নকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। তাই দ্রুত বিকল্প উৎসের সন্ধান এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে জোরালো কূটনীতিই এখন ভারতের প্রধান অস্ত্র হওয়া উচিত। যদি এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
(Feed Source: zeenews.com)
