
Indian Village Turtuk: পাকিস্তানের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করা হয়। লাদাখের তুরতুক গ্রামের ভাগ্য বদলে যায় রাতারাতি। অসাধ্যসাধন হল কী করে? লাদাখের এই গ্রাম পাকিস্তান থেকে ভারতের অংশ হয়ে উঠল কী ভাবে?
চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছে পাহাড়-পর্বত। কুল কুল শব্দে নদী বয়ে যাচ্ছে মাঝখান দিয়ে। সেই নদীর কিনারায় ছবির মতো সাজানো একটুকরো বসতি অঞ্চল। লাদাখের নুব্রা উপত্যকায় অবস্থিত তুরতুক গ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম।
লেহ্ থেকে ২২০ কিলোমিটার উত্তরে গেলে শাইলক নদীর তীরে অবস্থিত তুরতুক গ্রাম। কারাকোরাম এবং হিমালয়ের একেবারে মধ্যিখানে রয়েছে গ্রামটি। সিয়াচেন হিমবাগের দক্ষিণ-পশ্চিমে, ভারত এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের সীমারেখা থেকে অদূরেই। নিয়ন্ত্রণরেখা সংলগ্ন ওই অঞ্চল পাথুরে এবং রুক্ষ্ম। চড়াই উতরাই পেরিয়ে পৌঁছতে হয় গ্রামে। কিন্তু একবার পৌঁছলে আর চোখ ফেরানো যায় না।
১৯৪৭-’৪৮ সালের ইন্দো-পাক যুদ্ধে পাকিস্তানের হাতে গিয়ে ওঠে তুরতুক। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে ছিল তুরতুক। বর্তমানে সেটি ভারতের অন্তর্ভুক্ত। পাকিস্তান-বাল্টিস্তান অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র তুরতুকই ভারতের অধীনে রয়েছে। একরাতেই তুরতুকের ভাগ্য বদলে যায়।
১৯৭১ সালে ভারত এবং পাকিস্তান যুদ্ধের উপর নজর ছিল গোটা বিশ্বের। লাদাখে সেই যুদ্ধের তেমন কোনও রেশ পড়েনি। তবে সীমান্ত এলাকা থেকে কিছু হাতাহাতি, ঝামেলার খবর সামনে আসে।
কর্নেল চেওয়াং রিনচেনকে (সেই সময় ছিলেন মেজর) সেই সময় নুব্রা ভ্যালিতে পাঠানো হয়। সেখানে প্রায় ৫০০ স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে চারটি বাহিনী তৈরি করেন তিনি-কারাকোরামস সাসের, রিমো এবং সালতোরো। লক্ষ্য ছিল, যত সম্ভব পাকিস্তানি শিবির দখল করে নুব্রা এবং শাইলক উপত্যকাকে ভারতীয় সেনার নিয়ন্ত্রণে আনার।
মেজর রিনচেনের নেতৃত্বে খাড়া পার্বত্য অঞ্চল বেয়ে উঠে প্রথমে ১৮৪০২ পয়েন্টের দখল নেয় ভারতীয় সেনা। এর পর ক্রমশ চুলুংখা এবং তুরতুকের দিকে এগনো হয়। চুলুংখা হয়ে তুরতুক পৌঁছয় ভারতীয় সেনা। হাতছাড়া হওয়ার ২৩ বছর পর ফের তুরতুকের দখল নেয়। মেজর রিনচেনকে পরবর্তীতে ‘মহাবীর চক্র’ দিয়ে সম্মানিত করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। সেই সঙ্গেই ভারতের অংশ হয়ে ওঠে তুরতুক।
১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময়ও তুরতুকের আকাশে সাতটি পাকিস্তানি হোলিকপ্টার উড়তে শুরু করে। সেই সময় তুরতুককে রক্ষা করতে ১১ রাজপুতনা রাইফেলস, ৯ মাহারকে পাঠানো হয় ‘অপারেশন বিজয়’ অভিযানে। ৬-৭ জুন রাতে ক্যাপ্টেন হানিফউদ্দিনের কাছে নির্দেশ যায় ৫৫৯০ পয়েন্টটি দখল নেওয়ার। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায়, ১৮ হাজার ৫৫০ ফুট উচ্চতায় শুরু হয় মরণবাঁচন লড়াই।
লক্ষ্য থেকে যখন ৫০ মিটার দূরে, বাকিদের কভার দিতে, শত্রুকে লক্ষ্য় করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যান ক্য়াপ্টেন হানিফউদ্দিন। পয়েন্ট ৫৫৯০-এর দখল নেয় ভারতীয় সেনা। কিন্তু শত্রুর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মারা যান ক্যাপ্টেন হানিফউদ্দিন। তাঁর স্মৃতিতে ওই সাবসেক্টরের নাম রাখা হয় সাব সেক্টর হানিফ। মরণোত্তর ‘বীর চক্র’ দেওয়া হয় তাঁকে। মৃত্যুর সময় বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। ওই অভিযানে মারা যান নায়েব সুবেদার মঙ্গেজ সিংহও। মরণোত্তর ‘বীর চক্র’ দিয়ে সম্মানিত করা হয় তাঁকেও।
তুরতুকে মেরেকেটে ৪০০ পরিবারের বাস। সেখানে বাল্টিস্তানের রাজা ইয়াবগো মহম্মদ খান কাচোর প্রাসাদ রয়েছে। মূলত চাষবাস করেই জীবিকা নির্বাহ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আপেল, অ্যাপ্রিকট চাষ করেন।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তুরতুক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রণরেখা সংলগ্ন গ্রামটি সালতোরো রেঞ্জের কাছে অবস্থিত, যেখানে প্রকৃত গ্রাউন্ড পজিশন লাইন রয়েছে। ১৯৪৯ সালে স্বাক্ষরিত করাচি চুক্তি অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রণরেখার সর্বশেষ চিহ্নিত পয়েন্ট NJ9842-র উত্তরে অবস্থান। সেখানে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ যান চলাচলের উপযুক্ত সড়ক পথ রয়েছে। খারদুংলা গিরিপথটি টিসাতির কাছারাছি দুই ভাবে বিভক্ত হয়ে গিয়ে, তুরতুক এবং সিয়াচেন বেস ক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে।
পম্পা অধিকারী সিংহ (Feed Source: abplive.com)
