)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: উত্তরপ্রদেশের কানপুরে এক তরুণ আইনজীবীর আত্মহত্যার ঘটনা। এই ঘটনা শুধু মৃত্যু সংবাদ হিসেবে নয়, বরং আধুনিক সমাজের এক গভীর ও পুঁজ জমতে থাকা ক্ষতকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। গত বুধবার রাতে একটি অভিজাত বহুতল আবাসন থেকে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন শেষ করেছেন ৩৩ বছর বয়সী এক আইনজীবী। তবে এই মৃত্যুর চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে তাঁর ফেলে যাওয়া সাত পাতার সুইসাইড নোট এবং মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে দেওয়া হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস (WhatsApp Status)। তাঁর অন্তিম আরজি ছিল শিউরে ওঠার মতো– ‘ বাবা যেন আমার মৃতদেহ স্পর্শ না করে’।
ঘটনার বিবরণ
কানপুরের অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টে ওই আইনজীবী তাঁর পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন। পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, ঘটনার দিন অনেক রাত পর্যন্ত তিনি নিজের ঘরে কাজ করছিলেন। পরিবারের সদস্যরা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। গভীর রাতে তিনি বাড়ির ব্যালকনি থেকে নিচে ঝাঁপ দেন। প্রচণ্ড জোড় শব্দ শুনে আবাসনের নিরাপত্তাকর্মী ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। তাঁকে রক্তাক্ত ও সংজ্ঞাহীন অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রাথমিকভাবে একে দুর্ঘটনা বা কাজের চাপে মানসিক অবসাদজনিত আত্মহত্যা বলে মনে করা হলেও, পুলিসের হাতে তাঁর মোবাইল ফোন এবং ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া ডায়েরি আসতেই তদন্তের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়।
হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস
মৃত্যুর ঠিক কয়েক মিনিট আগে ওই তরুণ আইনজীবী তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন মাত্র চারটি শব্দ— ‘I lost, Papa won’ (আমি হেরে গেছি, বাবা জিতেছেন)। এই চারটি শব্দ এখন কানপুরের অলিতে-গলিতে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। একজন সন্তান কেন তাঁর জীবনের লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার জন্য নিজের বাবাকেই ‘জয়ী’ ঘোষণা করে গেলেন, তার উত্তর মিলেছে তাঁর সুইসাইড নোটে। এই স্ট্যাটাসটি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল, যা এক নিগৃহীত সন্তানের চরম হাহাকারকে তুলে ধরেছে।
সুইসাইড নোটের মর্মান্তিক সত্য
তদন্তে উদ্ধার হওয়া সাত পাতার দীর্ঘ ডায়েরি বা সুইসাইড নোটটি পড়তে গিয়ে খোদ পুলিস কর্মকর্তাদের চোখেও জল এসেছে। সেখানে তিনি তাঁর বাবার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের যৌন ও মানসিক নির্যাতনের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন।
পারিবারিক লালসার শিকার: নোটে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, শৈশব থেকেই তিনি তাঁর নিজের বাবার লালসার শিকার হয়েছেন। যে মানুষটির ওপর একটি শিশুর সুরক্ষার সবচেয়ে বেশি ভরসা থাকার কথা, সেই বাবার হাতেই বছরের পর বছর ধরে নিগৃহীত হতে হয়েছে তাঁকে।
মানসিক নিগ্রহ: শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্তরেও তাঁকে প্রতিনিয়ত ছোট করা হতো। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করতেন বাবা। সফল আইনজীবী হওয়ার পরেও তিনি সেই শৈশবের ট্রমা বা স্মৃতি থেকে বের হতে পারেননি।
অসহায়ত্ব: তিনি লিখেছেন, ‘বাইরে থেকে সবাই আমাকে সফল মনে করে, হাসিখুশি দেখে। কিন্তু কেউ জানে না প্রতি রাতে আমি কতটা আতঙ্কে কাটাতাম। লোকলজ্জার ভয়ে কাউকে কিছু বলতে পারিনি, কিন্তু ভেতর থেকে আমি প্রতিদিন মরে যেতাম।’
সুইসাইড নোটের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অংশ হলো তাঁর শেষ ইচ্ছা। তিনি পরিষ্কারভাবে লিখে গিয়েছেন যে, তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বা শেষকৃত্যের কোনও পর্যায়েই যেন তাঁর বাবা উপস্থিত না থাকেন। তিনি লিখেছেন, ‘যিনি আমার জীবনটা বিষিয়ে দিয়েছেন, শেষ বিদায়ের বেলায় তাঁর ছায়া যেন আমার ওপর না পড়ে। আমার বাবার শরীর যেন আমার মৃতদেহ স্পর্শ না করে।’ তিনি এমনকি তাঁর বাবার উপস্থিতিতে তাঁর শেষ বিদায়ও চাননি।
পেশাগত সাফল্য বনাম ব্যক্তিগত যাতনা
তদন্তে জানা গেছে, ওই আইনজীবী পেশাগত জীবনে যথেষ্ট প্রতিভাবান ও সফল ছিলেন। সহকর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু এই সাফল্যের চাকচিক্যের আড়ালে যে এক গভীর অন্ধকার লুকিয়ে ছিল, তা কেউ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবের যৌন নির্যাতনের (Childhood Abuse) শিকার ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ট্রমার মধ্য দিয়ে যান। অনেক ক্ষেত্রে ‘সারভাইভার্স গিল্ট’ বা অপরাধবোধ তাঁদের গ্রাস করে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁদের চরম বিষণ্নতা বা আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়।
পুলিসি পদক্ষেপ
নিহতের ভাইয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে কানপুর পুলিস ওই আইনজীবীর বাবার বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে আইপিসি-র ৩০৬ ধারায় মামলা রুজু করেছে। কানপুরের উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা (DCP) জানিয়েছেন, ‘সুইসাইড নোটটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে যাতে হাতের লেখা যাচাই করা যায়। নিহতের ফোনের কল রেকর্ড ও মেসেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের আঙুল যাঁর দিকে, সেই বাবাকে আপাতত পুলিসি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিস মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বয়ানও রেকর্ড করছে যাতে ঘরে দীর্ঘদিনের এই নির্যাতনের কথা অন্য কেউ জানত কি না তা নিশ্চিত করা যায়।
মনোবিদ ডঃ শর্মা এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হলে সমাজ তা আরও বেশি চেপে রাখতে চায়। পুরুষদের ‘শক্তিশালী’ হওয়ার যে সামাজিক কাঠামো, তা অনেক সময় নিগৃহীত পুরুষকে কথা বলতে বাধা দেয়। এই আইনজীবী হয়তো সারা জীবন সেই গ্লানি বয়ে বেরিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের বিচার না পেয়ে মৃত্যুকে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।’
কানপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, বাইরের পৃথিবী যতই অনিরাপদ হোক না কেন, ঘরের চার দেওয়ালও সবসময় নিরাপদ হয় না। ‘আই লস্ট, পাপা ওন– এই বাক্যটি সমাজকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একজন সন্তানকে কতটা অসহায় বোধ করলে নিজের জীবনের লড়াইয়ে মৃত্যুকে বেছে নিয়ে বাবাকে ‘বিজয়ী’ বলতে হয়?
আপনি কি অবসাদগ্রস্ত? বিষণ্ণ? চরম কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। আপনার হাত ধরতে তৈরি অনেকেই। কথা বলুন প্লিজ…
iCALL (সোম-শনি, ১০টা থেকে ৮টা) ৯১৫২৯৮৭৮২১
কলকাতা পুলিস হেল্পলাইন (সকাল ১০টা-রাত ১০টা, ৩৬৫ দিন) ৯০৮৮০৩০৩০৩, ০৩৩-৪০৪৪৭৪৩৭
২৪x৭ টোল-ফ্রি মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্বাসন হেল্পলাইন– কিরণ (১৮০০-৫৯৯-০০১৯)
(Feed Source: zeenews.com)
