
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: সম্প্রতি আটলান্টিক মহাসাগরে ভাসমান একটি প্রমোদতরীতে বিরল ও প্রাণঘাতী ‘হ্যান্টাভাইরাস’-এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। জানা গিয়েছে, ‘এমভি হন্ডিয়াস’ (MV Hondius) নামক একটি ক্রুজ জাহাজে এই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি করেছে এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস পরিচালিত এই জাহাজটি আর্জেন্টিনা থেকে কেপ ভার্দে হয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। জাহাজে প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। যাত্রাপথে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলের কাছাকাছি আসার পর যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরুতে এটিকে মারাত্মক শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ বলে মনে করা হয়েছিল। জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে একজন জার্মান নাগরিক এবং নেদারল্যান্ডসের এক স্বামী-স্ত্রী রয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারী প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ বিভাগের পরিচালক মারিয়া ভ্যান কারখোভ জানিয়েছেন, বর্তমানে এক ৬৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক দক্ষিণ আফ্রিকার একটি হাসপাতালে আইসিইউ-তে (ICU) সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন। বাকি দুই অসুস্থ যাত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেদারল্যান্ডসে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
রোগের সূত্রপাত এবং লক্ষ্মণ
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য বিভাগের মতে, প্রথম আক্রান্ত ছিলেন ৭০ বছর বয়সী এক ডাচ পুরুষ। উশুয়াইয়া থেকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে যাওয়ার পথেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং দ্বীপে পৌঁছানোর পরই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর তাঁর ৬৯ বছর বয়সী স্ত্রী জোহানেসবার্গের বিমানবন্দরে দেশের বিমান ধরার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিকটবর্তী হাসপাতালে মারা যান।
এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা, ডায়রিয়া, চরম ক্লান্তি এবং পেশীতে ব্যথা। রোগটি গুরুতর আকার ধারণ করলে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং ফুসফুসে তরল জমতে থাকে। আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)-এর মতে, শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া রোগীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই বাঁচতে পারেন না।
হ্যান্টাভাইরাস কী এবং এর বিস্তার
হ্যান্টাভাইরাস হলো মূলত একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ইঁদুরের মল, মূত্র বা লালার সংস্পর্শে এলে, কিংবা ইঁদুরের কামড় ও আঁচড় থেকে এই ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। আমেরিকায় এই ভাইরাসের সংক্রমণে ‘হ্যান্টাভাইরাস পালমোনারি সিন্ড্রোম’ (HPS) দেখা যায়, যা ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, এশিয়া ও ইউরোপে এটি কিডনি এবং রক্তনালীকে আক্রান্ত করে।
প্রতিরোধের উপায়
এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মূলত ইঁদুরের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। যে বিষয়গুলি খেয়াল রাখা উচিত:
১) ঘরবাড়ি ও কর্মক্ষেত্র সর্বদা পরিষ্কার রাখা।
২) ইঁদুর ঢোকার সম্ভাব্য পথগুলো সিল করে দেওয়া এবং খাবার সাবধানে ঢেকে রাখা।
৩) ইঁদুরের মলমূত্র পরিষ্কার করার আগে তা জীবাণুনাশক বা জল দিয়ে ভিজিয়ে নেওয়া, শুকনো অবস্থায় ঝাড়ু দেওয়া বা ভ্যাকুয়াম করা একেবারেই উচিত নয়।
৪) নিয়মিত এবং সঠিকভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।
যদিও বর্তমানে জাহাজে অন্য কোনো যাত্রীর মধ্যে নতুন করে উপসর্গ দেখা যায়নি, তবুও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে পুরো পরিস্থিতি কড়া নজরদারিতে রয়েছে। তবে পূর্ববর্তী প্রাদুর্ভাবের তথ্যের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বর্তমানে কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
(Feed Source: zeenews.com)
