Alia: সবেমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছেন! বয়স কতই বা আর! কিন্তু অল্প বয়সেই নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন অনুভব ওরফে আলিয়া। তিনিই উচ্চ মাধ্যমিকের একমাত্র রূপান্তরকামী পরীক্ষার্থী। জীবনে ভালবাসা পেয়েছেন, পেয়েছেন তিক্ততা, নিজের জীবনের গল্প বললেন আলিয়া নিজেই
নিজের জীবনযুদ্ধের গল্প লিখলেন আলিয়া
ঝাড়গ্রাম: ঝাড়গ্রামের অনুভব পাল, যিনি নিজেকে আলিয়া বলে পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দ, ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় একমাত্র রূপান্তরকামী পরীক্ষার্থী হিসেবে নজর কেড়েছেন। অনুভব থেকে আলিয়া হয়ে ওঠার যাত্রাপথ শুরু হয়েছিল যখন অনুভবের বয়স মাত্র ১০ বছর, বুঝেছিলেন, তাঁর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে নারী সত্ত্বা। সেই থেকে আজ…কতটা ভাললাগা, কতটা তিক্ততা, কতটা অসহায়তা পেরিয়েছেন অনুভব? নাকি সমাজের ‘ট্রোল’ তাঁকে ছুঁতেই পারেনি? লিখছেন খোদ অনুভব পাল…
আমি আলিয়া! অতীতে ছিলাম অনুভব। জন্মসূত্রে আমি পুরুষ, কিন্তু মননে বাস করত এক নারী। আমার জন্ম মামাবাড়িতে, সেখানেই বড় হওয়া। তখন আমর বয়স ১৩, দিদাকে ছেড়ে বাবার বাড়ি এলাম। ২০১৭ সালে দিদা চলে গেল। সেই প্রথম ভালবাসার মানুষকে হারানো। সেই প্রথম বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ানো। তখন থেকেই বুঝতে পারতাম, আমি আমার সমবয়সি আর পাঁচজনের থেকে আলাদা। কিন্তু ওই যে ভয়! ওই যে ‘কে কী ভাববে’র ট্যাবু তাড়া করে বেড়াত! খালি মনে হত, বাবা কী ভাববে? মা তো শুনেই আকাশ থেকে পড়বে! বুক কাঁপত… মা যদি মারে…
সেই বছর আমি ফাইভে উঠেছি। মামাবাড়ির পাড়ায় কালীপুজোয় এক দাদা হঠাৎ আমায় ‘হোমো’ বলে ডেকেছিল। তখন মানেটা বুঝিনি। বাড়ি ফিরে মাকে বলেছিলাম। মা কিছু বলেননি। পরের দিন সেই এক ঘটনা! দাদাটা আবার ‘হোমো’ বলে ডাকল! সেই আমার প্রথম ‘ট্রোল’-এর মুখে পড়া। তখন আমি ছোট… বয়স ১২-১৩… রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে শুনতে হত, ‘হাফ লেডিজ’, ‘হোমো’! এভাবেই চলছিল। এরমধ্যেই মা মারা গেলেন। আবারও একটা আঘাত! আবারও টেনেহিঁচড়ে বাস্তবের সামনে দাঁড় করানো। বুঝতে পারতাম, বাকি ছেলেদের মতো আমার ক্রিকেট-ফুটবল খেলতে ভাল লাগে না। বুঝতে পারতাম, আমি আলাদা!
দিন কাটতে লাগল! দিদা নেই, মা নেই…আমি বড্ড একা তখন! তবে পাশে ঠাকুমা ছিলেন। আমি তখন মূর্তি বানাতাম। নিজের ছোট একটা ব্যবসা করতাম। সমাজে কে কী বলছে, কান দিতাম না!২০২২-এর শেষের দিক, তখন আমি ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি। বাবা আবার বিয়ে করলেন। আবার জীবনে ভাঙন এল। বাবা আলাদা সংসার পাতলেন। বাড়িতে শুধু আমি আর ঠাকুমা। তখন থেকেই নিজে রোজগার করি। নিজের খরচ নিজেই চালাই। সেইভাবেই মাধ্যমিক দিই। মনের মধ্যে নিজেকে বদলানোর ইচ্ছে প্রবল। কিন্তু বাবাকে বলতে পারিনি। সে’বছরই জিবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাটা ঘটল। মাধ্যমিক টেস্ট পরীক্ষার পর পুজোর সময় খড়্গপুর গিয়েছিলাম। সেই আমার প্রথম রূপান্তর। সেই প্রথম শাড়ি পরে পুজোয় ঘোরা। সেখানেই কোনওভাবে বাবা আমায় দেখে ফেলেছিলেন। মেসেজ করে যে-কথাটা লিখেছিলেন, আমি বলতে পারব না। তবে এসএমএস-টা আজও আমার কাছে রাখা আছে! খুব কষ্ট পেয়েছিলাম! কিন্তু ভেঙে পড়িনি।
মা-বাবার সঙ্গে ছোট্ট অনুভব
সপ্তমীর দিন বাড়ি ফিরলাম। বাবা দশমীর দিন বাড়ি এলেন। বোঝালেন, আমার ইচ্ছে পূরণ হওয়া সম্ভব নয়! ভেবেছিলেন, হয়তো আমি কোনও পুরুষকে ভালবেসে নারী হতে চাই। কিন্তু বাবা ভুল বুঝেছিলে। আমি তখন কারও সঙ্গে সম্পর্কে ছিলাম না। আমি শুধু চুপ করে শুনেছিলাম। মাধ্যমিক দিলাম। মাধ্যমিকের শেষ পরীক্ষার দিন মাসির বাড়ি চলে যাই। মাসি আমায় খুব সাপোর্ট করেছিল।
শুরু হল উচ্চ মাধ্যমিকের প্রস্তুতি। বাড়ি ছেড়েছি। জীবনের দুটো খুঁটি মা আর দিদাকে হারিয়েছি। একদিকে আর্থিক অনটন, অন্যদিকে নিজেকে বদলানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষা…ভিতর থেকে দীর্ণ বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছিলাম। তবে হার মানিনি। মাথা নিচু করিনি। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে গিয়েছি। একাদশ শ্রেণিতে ঝাড়গ্রাম ননীবালা বিদ্যালয়ে লিঙ্গ নির্বাচনের জায়গায় পুরুষ, মহিলার পরিবর্তে অন্যান্য লিঙ্গ নির্বাচন করে ভর্তি হই। পাশে দাঁড়ায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। ছাত্রের পোশাক ছেড়ে ছাত্রীর পোশাক পরে স্কুলে ক্লাস শুরু করি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আর পাঁচটা বন্ধুর সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনাও করেছি।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৩৩৫ নম্বর পাই। ভবিষ্যতে দৃশ্যকলা নিয়ে বিশ্বভারতী বা রবীন্দ্রভারতীতে পড়ার ইচ্ছে। সেখানে সুযোগ না পেলে বাংলা বা ভূগোলে স্নাতক পড়ব। এখন বাড়ি-বাড়ি টিউশন পড়াই। নাচ-আঁকা শিখিয়ে টাকা রোজগার করি। সেই টাকাতেই নিজের পড়াশোনার খরচ চালাই। কারও কাছে হাত পাতিনি। হরমোনের চিকিৎসা চলছে। শেষ হলেই অস্ত্রোপচার। টিউশন করেই পড়াশুনা, চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। আমার বিশ্বাস, আমি ঠিক পারব!
অনুলেখন: রুক্মিণী মজুমদার
(Feed Source: news18.com)