)
International Yoga Day: প্রথম ‘যোগ’ শব্দের উল্লেখ মেলে ঋগ্বেদ-এ । তবে সেখানে এটি মূলত মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার এবং দিব্য শক্তির সাথে যুক্ত হওয়ার প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: যোগ বিদ্যার উত্পত্তি ভারতে। প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশের মুনি ঋষিদের মধ্যে ছিল যোগ বিদ্যার অভ্যাস। ধীরে ধীরে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়াতে থাকে। প্রাচীন ভারতে যোগবিদ্যার উৎপত্তি হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে। ঐতিহ্য অনুযায়ী, শিবকে ‘আদিযোগী’হিসেবে গণ্য করা হয়।
হিমালয়ের কান্তিসরোবর হ্রদের তীরে শিব তাঁর এই পরম জ্ঞান প্রথম ৭ ঋষি বা ‘সপ্তর্ষি’-র মধ্যে সঞ্চারিত করেছিলেন। পরবর্তীতে ওই ঋষিরা যোগের এই বিদ্যাকে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং আমেরিকার মতো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেন। তবে সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রাপ্ত বিভিন্ন সিলমোহর ও মূর্তি, বিশেষ করে ‘পশুপতি সিলমোহর’, প্রমাণ করে যে সেই প্রাচীন যুগেও ভারতে যোগের ব্যাপক প্রচলন ছিল। এরপর বৈদিক যুগে রচিত মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম গ্রন্থ ‘ঋগ্বেদ’-এ প্রথম ‘যোগ’ শব্দটির লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে উপনিষদ এবং ভগবদ্গীতায় যোগের দর্শন ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বকে আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে মন ও আত্মাকে পরমাত্মার সাথে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
যোগের বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে একটি সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত রূপ দেন মহর্ষি পতঞ্জলি। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘যোগসূত্র’ গ্রন্থে যোগের তত্ত্ব ও অনুশীলনকে সংকলিত করেন। তিনি যোগকে ‘অষ্টাঙ্গ যোগ’ বা আটটি ধাপে বিভক্ত করেন, যার মধ্যে রয়েছে যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান এবং সমাধি। এই সূত্রগুলো কেবল শারীরিক ব্যায়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং মনকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং মোক্ষ বা মুক্তি লাভের এক চূড়ান্ত গাইডবুক হিসেবে কাজ করেছিল। পরবর্তীতে মধ্যযুগে ‘হঠযোগ’-এর বিকাশ ঘটে, যা মূলত শরীর ও প্রাণের শুদ্ধিকরণের ওপর জোর দেয় এবং আজকের আধুনিক যোগের ভিত্তি তৈরি করে। প্রাচীন ভারতের ঋষি-মুনিদের এই গভীর সাধনা ও গবেষণার ফসলই হলো যোগবিদ্যা।
প্রথম ‘যোগ’ শব্দের উল্লেখ মেলে ঋগ্বেদ-এ । তবে সেখানে এটি মূলত মন ও ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করার এবং দিব্য শক্তির সাথে যুক্ত হওয়ার প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল। অথর্ববেদেও প্রাণায়াম বা শ্বাস নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক রূপের উল্লেখ আছে।
উপনিষদ যুগে যোগের দর্শন আরও স্পষ্ট হয়। কঠোপনিষদে প্রথমবার যোগের সংজ্ঞা দিয়ে বলা হয়েছে— মন এবং পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে স্থির রাখাই হলো যোগ। এছাড়া শ্বেতাশ্বেতর উপনিষদে ধ্যান করার সঠিক পদ্ধতি, আসন এবং এর আধ্যাত্মিক সুফলের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
মহর্ষি পতঞ্জলি রচিত ‘যোগসূত্র’ হল যোগ দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, মৌলিক ও প্রামাণ্য গ্রন্থ। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে তিনি প্রাচীন ভারতের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যোগের জ্ঞানকে ১৯৬টি সূত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংকলিত করেন। এই গ্রন্থের মূল ভিত্তি হলো ‘অষ্টাঙ্গ যোগ’ বা আটটি ধাপ— যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান এবং সমাধি। পতঞ্জলির মতে, যোগের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের মনের চঞ্চলতাকে সম্পূর্ণ শান্ত করা। তাঁর এই কালজয়ী সৃষ্টি কেবল শারীরিক কসরত বা ব্যায়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের মন, বুদ্ধিমত্তা ও আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করে পরম মুক্তি বা সমাধি লাভের এক অনন্য গাইডবুক হিসেবে কাজ করে।
প্রাচীন ভারতে যোগের সূচনা আত্মোপলব্ধির এক গভীর আধ্যাত্মিক সাধনা হিসেবে। বিশ শতকে স্বামী বিবেকানন্দ, পরমহংস যোগানন্দ এবং পরবর্তীতে বি কে এস আয়েঙ্গারের মতো যোগগুরুদের হাত ধরে এই প্রাচীন বিদ্যা পাশ্চাত্যে পৌঁছায় এবং আধুনিক রূপ নিতে শুরু করে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে, বিশেষ করে ২০১৪ সালে জাতিসংঘের মাধ্যমে ‘আন্তর্জাতিক যোগ দিবস’-এর স্বীকৃতির পর, যোগ তার ধর্মীয় ও ভৌগোলিক গণ্ডি পেরিয়ে এক বৈশ্বিক গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আজকের দিনে যোগ কেবল আধ্যাত্মিকতা নয়, বরং মানসিক চাপ দূর করা, শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত বিজ্ঞান হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক সাধনা যোগ আজ বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল বাণিজ্যিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের সুস্থ জীবনযাত্রার চাহিদাকে কেন্দ্র করে এই বাজারের পরিধি ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে কেবল যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষণই নয়, এর সাথে যুক্ত হয়েছে যোগার পোশাক (যেমন লুলুলেমন ব্র্যান্ড), বিশেষ ম্যাট, আধুনিক গ্যাজেট, মোবাইল অ্যাপ এবং বিলাসবহুল ইয়োগা রিট্রিট বা সুস্থতা পর্যটন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যোগ এখন একটি লাভজনক কর্পোরেট ব্যবসা ও লাইফস্টাইল ট্রেন্ড। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার এই বৈশ্বিক আন্দোলনটি আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বিরাট অবদান রাখছে।
(Feed Source: zeenews.com)
