)
Historical earthquakes: প্রকৃতির চরম তাণ্ডব! মিনিটে ২ বার কেঁপে উঠল দেশ! ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে ভারতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। কেন সাবধান হতে হবে ভারতকে?
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: প্রকৃতির তাণ্ডবের সামনে মানুষ যে কতটা অসহায়, তা আরও একবার প্রমাণ হলো ভেনেজুয়েলায়। মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল গোটা দেশ। ভেঙে পড়েছে বহু ঘরবাড়ি, বিপর্যস্ত জনজীবন। গত ১০০ বছরের ইতিহাসে ভেনেজুয়েলায় এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ক্যারিবিয়ান ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের মিলনস্থলে অবস্থিত এই দেশ বরাবরই ভূমিকম্পপ্রবণ; এর আগে ১৮১২ সালেও এখানে ভূমিকম্পে প্রায় ৩০,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
ভেনেজুয়েলার এই সাম্প্রতিক বিপর্যয় আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে বিশ্বের ইতিহাসের এমন কিছু বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কথা, যা শুধুমাত্র লাখ লাখ প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ মোকাবিলা পদ্ধতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই ইতিহাস থেকে ভারতের মতো জনবহুল দেশের শেখার রয়েছে অনেক কিছু।
তাংশান ভূমিকম্প, চিন (১৯৭৬): পরিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন
১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই চিনের শিল্পনগরী তাংশানে আঘাত হানে ৭.৬ তীব্রতার এক প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্প। গভীর রাতে যখন মানুষ ঘুমে মগ্ন, ঠিক তখনই মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে শহরের প্রায় ৮৫% বহুতল ও আবাসন। সরকারি হিসেবে ২ লক্ষ ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু হলেও, বেসরকারি মতে এই সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৬ লক্ষ। এই ট্র্যাজেডি চিনের পরিকাঠামো উন্নয়নে চোখ খুলে দেয়। চিন বুঝতে পারে যে জনবহুল শহরে অপরিকল্পিত নির্মাণ কতটা বিপজ্জনক। এরপর দেশজুড়ে কঠোর বিল্ডিং কোড চালু করা হয় এবং ‘ভূমিকম্প-সহনশীল’ আবাসন নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
ভারত মহাসাগরীয় সুনামি (২০০৪): প্রযুক্তির মেলবন্ধন
সুমাত্রা উপকূলে ৯.১ তীব্রতার মেগা-ভূমিকম্পের জেরে সৃষ্টি হয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী সুনামি। সমুদ্রের দানবীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছিল ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ একাধিক দেশের উপকূলে। মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায় প্রায় ২ লক্ষ মানুষের জীবন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (USGS)-এর মতে, এটি ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় শিক্ষা। সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশগুলোকে আগে থেকে সতর্ক করার কোনো ব্যবস্থা তখন ছিল না। এই ঘটনার পরেই তৈরি হয় ‘ইন্ডিয়ান ওশেন সুনামি ওয়ার্নিং অ্যান্ড মিটিগেশন সিস্টেম’, যা আজ উপকূলের কোটি কোটি মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে।
হাইতি ভূমিকম্প (২০১০): তদারকি ও নিজস্ব বাহিনীর গুরুত্ব
২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি হাইতিতে ৭.০ তীব্রতার এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে রাজধানী পোর্ট-অব-প্রিন্স নিমেষেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। হাসপাতাল, স্কুল ও সরকারি ভবনসহ হাজার হাজার বহুতল হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। প্রাণ হারান প্রায় আড়াই থেকে তিন লক্ষ মানুষ। এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল অত্যন্ত সস্তা ও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি বহুতল। হাইতির এই ট্র্যাজেডি বিশ্বকে শেখায় যে, শুধু খাতায়-কলমে ‘বিল্ডিং কোড’ থাকলেই হবে না, তা মাটিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে সরকারি স্তরে তদারকি করতে হবে। এছাড়া, ঘিঞ্জি শহর উদ্ধারকাজে বাধা দেয় বলে চওড়া রাস্তা ও খোলামেলা জায়গাসহ সুপরিকল্পিত নগর তৈরি আবশ্যক। সবচেয়ে বড় শিক্ষা—আন্তর্জাতিক সাহায্যের ভরসায় না থেকে প্রতিটি দেশের নিজস্ব ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ থাকা জরুরি।
গ্রেট ইস্ট জাপান ভূমিকম্প (২০১১): চেইন রিঅ্যাকশনের মোকাবিলা
২০১১ সালে জীবনযাত্রা ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে চরম উন্নত দেশ জাপানকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ৯.০ তীব্রতার এক মহাসামুদ্রিক ভূমিকম্প ও সুনামি। প্রায় ৪০ মিটার উঁচু সুনামির ঢেউ জাপানের বুলেট ট্রেন, আধুনিক আবাসন ও পরিকাঠামোকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রে তৈরি হয় মারাত্মক নিউক্লিয়ার বিপর্যয়। প্রযুক্তির চরম শিখরে থাকা সত্ত্বেও এই দুর্যোগে প্রায় ১৮,০০০ মানুষ প্রাণ হারান। এই ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতির সর্বোচ্চ রুদ্ররূপের কাছে শুধু প্রযুক্তি যথেষ্ট নয়। এর থেকে বিশ্ব শিক্ষা পায়, ভূমিকম্পের পর সুনামি এবং তার থেকে পরমাণু দুর্ঘটনা—এই চেইন রিঅ্যাকশনের জন্য পরিকাঠামো প্রস্তুত রাখা। এরপর জাপান তাদের সমুদ্র-প্রাচীর আরও উঁচু ও মজবুত করে। মোবাইল নেটওয়ার্কে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রযুক্তি উন্নত করা হয় এবং উঁচু স্থানে দ্রুত আশ্রয় নেওয়ার জন্য বিশেষ ‘ইভাকুয়েশন রুট’ ও নিয়মিত মক ড্রিল বাধ্যতামূলক করা হয়।
ভারতের জন্য কী বার্তা?
“ভূমিকম্পের নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া আজও অসম্ভব, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৯০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব।” ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি এবং অতীতের এই বিপর্যয়গুলো ভারতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। ভারতের একটি বিশাল অংশ উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং দিল্লি-সহ একাধিক মেট্রো শহর বড়সড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
তাই হাইতি বা চিনের মতো বিপর্যয় এড়াতে ভারতকে এখনই নিচের পদক্ষেপগুলো আরও কঠোরভাবে নিতে হবে:
কঠোর বিল্ডিং কোড: প্রতিটি নতুন নির্মাণে ভূমিকম্প-সহনশীল প্রযুক্তির শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
পরিকাঠামোগত অডিট: পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতলগুলোর শক্তি পরীক্ষা করা।
জনসচেতনতা ও মহড়া: স্কুল, কলেজ ও অফিস স্তরে নিয়মিত ভূমিকম্পকালীন করণীয় নিয়ে মক ড্রিল করা।
(Feed Source: zeenews.com)
