এমবাপেকে টপকে গোল্ডেন বুট কি জিততে পারবেন মেসি? কীভাবে কাজ করে ‘অ্যাসিস্ট’ এর নিয়ম?

এমবাপেকে টপকে গোল্ডেন বুট কি জিততে পারবেন মেসি? কীভাবে কাজ করে ‘অ্যাসিস্ট’ এর নিয়ম?

 

Football

-Ritesh Ghosh

এক আকর্ষণীয় ফুটবল মুহূর্তের সাক্ষী হতে চলেছে বিশ্ব। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি কেবল আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যে ট্রফি জয়ের ডুয়েল নয়, এটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্মাননা ‘গোল্ডেন বুট’ পাওয়ার চূড়ান্ত পরীক্ষাও বটে। ফ্রান্সের তারকা স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপে এবং আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসির মধ্যে এই ট্রফি জয়ের এক তীব্র লড়াই জমে উঠেছে। বর্তমানে টুর্নামেন্টে ১০টি গোল করে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন এমবাপে, যেখানে মেসি আটটি গোল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে তাড়া করছেন ফরাসি ফরোয়ার্ডকে।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জোড়া গোল করে এমবাপে নিজের গোল সংখ্যাকে দুই অঙ্কের ঘরে নিয়ে গেছেন। তবে মেসির সামনে এখনও বড় সুযোগ রয়েছে ফাইনালে নিজের ঝুলিকে আরও সমৃদ্ধ করার। স্পেনের বিরুদ্ধে শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মেসি যদি দুই বা তার বেশি গোল করতে পারেন, তবেই এমবাপেকে টপকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। ফাইনাল ম্যাচের উত্তেজনার মাঝে এই গোল্ডেন বুটের জটিল সমীকরণ নিয়ে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কৌতূহলের শেষ নেই।

Messi and Mbappe Golden Boot showdown

আসলে অনেকেই ভাবেন, সমান গোল হলে ট্রফিটি কীভাবে ভাগ করা হয়। গোল সংখ্যার সমতা ভাঙার জন্য বিশ্ব ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা ফিফার কিছু নির্দিষ্ট এবং স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। এই নিয়মগুলি মূলত তৈরি করা হয়েছে যাতে কোনও যৌথ বিজয়ী ঘোষণা না করে এককভাবে টুর্নামেন্টের সেরা গোলদাতাকে বেছে নেওয়া যায়। আধুনিক ফুটবলে এই সূক্ষ্ম নিয়মগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।

গোল্ডেন বুটের শীর্ষ লড়াই ও বর্তমান পরিসংখ্যান

চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা প্রধান খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের দিকে তাকালে বোঝা যাবে লড়াইটি কতটা জমজমাট। ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহাম ৭ গোল করে তাঁর অভিযান শেষ করেছেন। অন্যদিকে স্পেনের স্ট্রাইকার মিকেল ওয়ারজাবাল ৫টি গোল নিয়ে ফাইনালে মাঠে নামবেন, যদিও তাঁর পক্ষে শীর্ষে থাকা খেলোয়াড়দের ধরা প্রায় অসম্ভব। নিচে গোল্ডেন বুট লড়াইয়ের শীর্ষ চার তারকার পরিসংখ্যান দেওয়া হল।

খেলোয়াড়ের নাম দেশ গোল সংখ্যা অ্যাসিস্ট বর্তমান অবস্থা
কিলিয়ান এমবাপে ফ্রান্স ১০ ম্যাচ শেষ
লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনা ফাইনাল বাকি
জুড বেলিংহাম ইংল্যান্ড ম্যাচ শেষ
মিকেল ওয়ারজাবাল স্পেন ফাইনাল বাকি

ফিফার টাইব্রেকার নিয়ম কী এবং কীভাবে কাজ করে?

বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান মাপকাঠি হল টুর্নামেন্টের সব ম্যাচ মিলিয়ে করা গোল সংখ্যা। কিন্তু ফাইনাল ম্যাচের পর যদি একাধিক খেলোয়াড় সমান সংখ্যক গোল করে তালিকায় শীর্ষে থাকেন, তবে ফিফা প্রথম টাইব্রেকার হিসেবে অ্যাসিস্টের বা গোল করতে সহায়তার সংখ্যা বিবেচনা করে। যে খেলোয়াড় পুরো টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট করেছেন, তিনিই গোল্ডেন বুটের প্রকৃত মালিক হবেন।

বর্তমানে এমবাপে এবং মেসি উভয়েরই টুর্নামেন্টে ৪টি করে সফল অ্যাসিস্ট রয়েছে। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপ প্রতিটি ম্যাচের ভিডিও বিশ্লেষণ করে অ্যাসিস্টের বিষয়টি নির্ধারণ করে থাকে। সাধারণত কোনও খেলোয়াড়ের পাস বা ক্রসের ওপর ভিত্তি করে যখন তার সতীর্থ সরাসরি গোল করেন, তখন সেটিকে অ্যাসিস্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে গোলরক্ষক বা ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল ফেরত আসার পর গোল হলেও কিছু ক্ষেত্রে অ্যাসিস্টের কৃতিত্ব দেওয়া হয়।

যদি দেখা যায় যে দুটি খেলোয়াড় কেবল গোলের সংখ্যাতেই নয়, বরং অ্যাসিস্টের দিক থেকেও সমতায় রয়েছেন, তবে বিজয়ী নির্ধারণে দ্বিতীয় টাইব্রেকার নিয়ম প্রয়োগ করা হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্টে মাঠে সবচেয়ে কম সময় কাটানো খেলোয়াড়কে গোল্ডেন বুট দেওয়া হয়। এই নীতির প্রধান যুক্তি হল মাঠে কম সময়ে বেশি অবদান রাখা। অর্থাৎ, কম সময় খেলে সমান গোল করা খেলোয়াড়ের গোল করার দক্ষতা বেশি বলে ধরে নেওয়া হয়।

অতীতের বিশ্বকাপ এবং টাইব্রেকারের অনন্য ইতিহাস

বিশ্বকাপের শুরুর বছরগুলিতে কিন্তু এমন কোনও নিয়ম ছিল না। ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের পূর্ব পর্যন্ত একাধিক খেলোয়াড় সমান গোল করলে যৌথভাবে গোল্ডেন বুট শেয়ার করতেন। তবে টুর্নামেন্টকে আরও আকর্ষণীয় করতে ১৯৯৪ সালে অ্যাসিস্টের নিয়ম চালু করা হয়। এরপর ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে মাঠে কম সময় খেলার নিয়মটি আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়মাবলীতে যুক্ত হয়, যা গোল্ডেন বুটের প্রতিযোগিতা আরও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে।

ইতিহাসের পাতায় এই টাইব্রেকার নিয়মের সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গিয়েছিল ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে। সেবার জার্মানির টমাস মুলার, স্পেনের ডেভিড ভিয়া, ডাচ তারকা ওয়েসলি স্নেইডার এবং উরুগুয়ের ডিয়েগো ফোরলান প্রত্যেকেই টুর্নামেন্টে ৫টি করে গোল করেছিলেন। কিন্তু টমাস মুলার ৩টি অ্যাসিস্ট করার কারণে গোল্ডেন বুট বিজয়ী ঘোষিত হন, যেখানে বাকি তিন খেলোয়াড়ের ঝুলিতে ছিল মাত্র ১টি করে অ্যাসিস্ট।

এই পরিসংখ্যান ও নিয়মের মারপ্যাঁচে এবারের ফাইনালে মেসির কাজটা বেশ কঠিন হতে চলেছে। মেসি যদি ফাইনালে জোড়া গোল করেন এবং কোনও অ্যাসিস্ট না পান, তবে তাঁর মোট গোল হবে ১০ এবং অ্যাসিস্ট থাকবে ৪টি। অর্থাৎ তিনি এমবাপের সমান অবস্থানে পৌঁছবেন। কিন্তু মেসি যদি ফাইনালে ৫৭ মিনিটের বেশি মাঠে খেলেন, তবে তিনি খেলার সময়ের ক্ষেত্রে এমবাপের চেয়ে পিছিয়ে পড়বেন এবং এমবাপেই গোল্ডেন বুট পেয়ে যাবেন।

তাই লিওনেল মেসির জন্য এই ম্যাচে শুধু গোল করাই যথেষ্ট নয়, সময়ের হিসাবও মাথায় রাখতে হবে। গোল্ডেন বুট নিজের নামে করতে হলে মেসিকে নির্ভেজাল হ্যাটট্রিক করতে হবে অথবা এমন অবদানের স্বাক্ষর রাখতে হবে যেন এমবাপের রেকর্ড ভেঙে যায়। এই জটিল সমীকরণ ও মাঠের তুমুল লড়াই উপভোগ করতে ফুটবলবিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে আর্জেন্টিনার জাদুকরী পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

(Feed Source: oneindia.com)