বিস্মৃতির আড়ালে মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ! ভারতের প্রথম সশস্ত্র মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী রানি শিরোমণি

বিস্মৃতির আড়ালে মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ! ভারতের প্রথম সশস্ত্র মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী রানি শিরোমণি

West Medinipur News: পশ্চিম মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের বহু আগে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনিই ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থান বা ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’-এর মূল নেত্রী।

মেদিনীপুর, রঞ্জন চন্দ: বিপ্লবের পীঠস্থান মেদিনীপুরের মাটি বারবার জন্ম দিয়েছে সশস্ত্র বিপ্লবীদের। তবে এই ইতিহাস ঘাঁটলে এমন এক বীরাঙ্গনার নাম উঠে আসে, যাঁর বীরত্ব আজ অনেকাংশেই বিস্মৃত। তিনি হলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের জন্মের বহু আগে, ভারতের প্রথম মহিলা হিসেবে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনিই ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী প্রথম সশস্ত্র কৃষক অভ্যুত্থান বা ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’-এর মূল নেত্রী। তাই অনেক ঐতিহাসিকের কাছে তিনি আক্ষরিক অর্থেই ‘মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ’।

কেশরী বংশের রাজা অজিত সিংহের মৃত্যুর পর রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রানি শিরোমণি। তাঁর শাসনে মাকড়া পাথর ও পোড়া ইঁটে তৈরি কর্ণগড়ের রাজপ্রাসাদ হয়ে ওঠে ইংরেজ বিরোধী লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র। রানি দু’হাত ভরে বিপ্লবের জন্য অর্থ ব্যয় করতে থাকেন। ১৭৯৮ সালে প্রায় ৪০০ কৃষক লাঠি, বল্লম, তীর-ধনুক নিয়ে ব্রিটিশদের সরকারি অফিস ও গুদামঘর আক্রমণ করে। এই গণ-অভ্যুত্থানকে খাটো করে দেখানোর জন্যই ব্রিটিশরা এর নাম দিয়েছিল ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’। এই বিদ্রোহের আগুনে ব্রিটিশ বাহিনী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং খাদ্য ও জলের অভাবে ধুঁকতে থাকে।

অবস্থা বেগতিক দেখে কোম্পানি মেদিনীপুরে বিশাল আধুনিক ইংরেজ সেনাবাহিনী তলব করে। গোলা, বারুদ ও বন্দুক নিয়ে তারা রানির দুর্গ চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। সুড়ঙ্গপথে কর্ণগড় থেকে আবাসগড়ে যাওয়ার সময় ১৭৯৯ সালের ৬ এপ্রিল রানি শিরোমণি বন্দি হন। তিনিই ছিলেন অবিভক্ত মেদিনীপুরের প্রথম রাজনৈতিক বন্দি। এরপর তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্রিভি কাউন্সিল তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীকালে নাড়াজোলের রাজা আনন্দলাল খানের মধ্যস্থতায় রানিকে আবাসগড়ে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।

দীর্ঘ বন্দিদশা কাটানোর পর ১৮১২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর রানি শিরোমণি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল নাকি তাঁকে গুপ্তহত্যা করা হয়েছিল, তা নিয়ে আজও মেদিনীপুরবাসীর মনে সংশয় রয়েছে। বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুরের কর্ণগড়ের সেই ধ্বংসস্তূপ আজও এই বীরাঙ্গনার বীরত্বের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাসবিদদের একাংশের জোরালো দাবি, দেশের প্রথম মহিলা সশস্ত্র সংগ্রামীর এই হারিয়ে যাওয়া বীরগাথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যাতে আগামী প্রজন্ম তাঁর আত্মত্যাগের ইতিহাস আরও ভাল ভাবে জানতে পারে।

(Feed Source: news18.com)