পিছিয়ে পড়া শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে অভিনব পাঠশালা, কেশিয়াড়ির পোস্টমাস্টারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ

পিছিয়ে পড়া শিশুদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে অভিনব পাঠশালা, কেশিয়াড়ির পোস্টমাস্টারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ

West Medinipur News: কানপুর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার পরেশ বেরা সম্প্রতি ভারতীয় ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে ‘পোস্টাল হিরো’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। প্রান্তিক মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই সম্মান পেয়েছেন।

কেশিয়াড়ি, রঞ্জন চন্দ: মাত্র উনিশ বছর বয়সেই ডাক বিভাগে চাকরি পেয়েছিলেন তিনি। কাজের সুবাদে সাইকেলে চেপে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকায় চিঠি বা মানি অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার সময় তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন প্রান্তিক মানুষের জীবনযন্ত্রণা। দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড় করতে যাঁদের দিনরাত কায়িক পরিশ্রম করতে হয়, তাঁদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা যে এক দূরস্ত স্বপ্ন, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ি ব্লকের কানপুর গ্রামের বাসিন্দা পরেশ বেরা। বর্তমানে তিনি কাঁথি ডিভিশনের অধীন কানপুর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার হিসেবে কর্মরত। গ্রামীণ এলাকার মানুষের এই নিরক্ষরতার অন্ধকার ঘোচাতেই এক অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি।
কাজের ফাঁকে ওই হতদরিদ্র মানুষগুলোর কথা ভেবেই তাঁর কলম চলত, নিজের লেখনীতে বারবার তুলে ধরেছেন তাঁদের কথা। নিজে চাকরি করার পাশাপাশি কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন, আবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের গৃহশিক্ষকতাও করেছেন পরম যত্নে। এক সময় তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন, এই পিছিয়ে পড়া পরিবারের শিশুদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া ছাড়া সমাজের মূলগত উত্তরণ সম্ভব নয়। সেই তাগিদ থেকেই এলাকার ছেলেমেয়েদের জন্য তিনি বাড়িতেই শুরু করেন এক অভিনব পাঠশালা, যার মূল লক্ষ্য ছিল নামমাত্র খরচে প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ ঘটানো।
২০১৬ সালে গ্রামীণ পড়ুয়াদের বিদ্যালয়মুখী করতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিরসা মুন্ডা স্মৃতি রক্ষা কমিটি’। এই মহৎ উদ্যোগেরই দু’টি অবিচ্ছেদ্য শাখা হল, ‘বিরসা মুন্ডা স্মৃতি শিক্ষা নিকেতন’ এবং ‘কথা বলা ও মনোযোগ পাঠাগার’। এলাকার বেশ কয়েকজন উৎসাহী যুবক-যুবতীকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলা এই প্রতিষ্ঠানে শুধু পুঁথিগত বিদ্যাই নয়, কচিকাঁচাদের নিয়মিত শেখানো হয় গান, নাচ এবং ছবি আঁকা। বেশ কয়েক বছর আগেও যে গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলমুখী হতে চাইত না, আজ তারাই পরেশবাবুর হাত ধরে শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরতে শুরু করেছে আনন্দের সঙ্গে।
কর্মজীবনের আর মাত্র কয়েকটা বছর বাকি তাঁর। তা সত্ত্বেও প্রতিদিন সকালে নিজের কাজের আগে নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের পড়ান তিনি। প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে তাঁদের সাক্ষর করে তোলার এই নিরলস ও নিঃস্বার্থ প্রয়াসকে স্বীকৃতি দিতে সম্প্রতি ভারতীয় ডাক বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘পোস্টাল হিরো’ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। এক সময় যে মানুষটা কাঁধে চিঠির ঝোলা নিয়ে মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরতেন, আজ তিনি শিক্ষার আলো হাতে সমাজ গড়ার এক নীরব কারিগর। তাঁর এই অসামান্য উদ্যোগ এবং মহৎ কাজকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকার সর্বস্তরের মানুষ।
(Feed Source: news18.com)