
কী এই পুরো ঘটনা?
অরবিন্দ আই হাসপাতালে ১৬ বছরের এক কিশোর এসেছিল। গত এক মাস ধরে তার বাঁ চোখের পাতা ফুলে ছিল। যদিও তার কোনও ব্যথা ছিল না এবং এর আগে ওই জায়গায় কোনও আঘাতও লাগেনি। কিন্তু এই ফোলার কারণ বুঝতে না পেরে সে চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
‘দ্য কনভারসেশন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসকেরা সম্পূর্ণ পরীক্ষা করার সময় ফোলা অংশের ভিতরের দিকে শক্ত, সাদা রঙের দুটি উঁচু অংশ দেখতে পান। সিটি স্ক্যানে জানা যায়, চোখের কোটরের উপরের অংশ থেকে দাঁতের মতো একটি গঠন বেরিয়ে আসছে। এর মধ্যে দাঁতের মুকুট ও রুট—দুটিই ছিল। বাইরে বেরিয়ে থাকা অংশটি দুটি সূচালো দাঁতের মতো দেখতে ছিল।
‘হেলথ অ্যান্ড মি’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিকিৎসক মেঘনা তনওয়ার জানিয়েছেন, উঁচু অংশগুলি স্পর্শ করলে বেশ মসৃণ ও শক্ত মনে হচ্ছিল। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করে সেটি বের করে দেন। পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি সম্পূর্ণ বিকশিত একটি ক্যানাইন বা কুকুরের মতো দাঁত। এর মধ্যে কোনও টিউমারের অংশ ছিল না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের দাঁতকে বলা হয় ‘এক্টোপিক টুথ’।
এক্টোপিক টুথ কী?
এক্টোপিক টুথ হল এমন একটি দাঁত, যা ভুল জায়গায় গজায় বা তৈরি হয়। কিছু দাঁত মুখের ভিতরেই ভুল অবস্থানে থাকে, আবার কিছু দাঁত সম্পূর্ণ অন্য কোনও জায়গায় বিকশিত হয়। ওই কিশোরের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ধরনের ঘটনাই ঘটেছিল। দাঁতটি চোখের উপরের অংশে ছিল, যেখানে দাঁত থাকার কোনও কথাই নয়।
চিকিৎসকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, এটি হয়তো বিশেষ ধরনের টিউমার, ‘টেরাটোমা’ হতে পারে। এই ধরনের টিউমারে হাড় বা দাঁতের টিস্যু থাকতে পারে। কিন্তু ইমেজিং এবং অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করা গঠনটি পরীক্ষা করার পর স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এটি আসলে একটি প্রকৃত ও পরিণত দাঁত।
এক্টোপিক দাঁত কীভাবে শনাক্ত করা হয় এবং এর চিকিৎসা কী?
এক্টোপিক দাঁত বের করা হবে কি না, তা নির্ভর করে দাঁতটি কোথায় রয়েছে এবং সেটি কোনও সমস্যা তৈরি করছে কি না, তার উপর। দাঁতটি যদি একাই থাকে এবং কোনও উপসর্গ সৃষ্টি না করে, তাহলে কখনও কখনও শুধু পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কিন্তু দাঁতটি যদি সংক্রমণ ছড়ায়, কোনও পথ বন্ধ করে দেয়, আশপাশের অংশের ক্ষতি করে অথবা সিস্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি বের করা জরুরি হয়ে পড়ে।
চিকিৎসকেরা স্ক্যানের সাহায্যে দাঁতটির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করেন এবং তার আশপাশে কী রয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখেন। সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে বোঝা যায়, দাঁতটি চোখ, স্নায়ু বা রক্তনালির কতটা কাছে রয়েছে। এর ভিত্তিতেই অস্ত্রোপচার করা প্রয়োজন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নাক বা সাইনাসের মধ্যে দাঁত থাকলে চিকিৎসকেরা প্রায়ই এন্ডোস্কোপ ব্যবহার করেন। এটি একটি সরু নল, যার মধ্যে ক্যামেরা ও অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম লাগানো থাকে। এর সাহায্যে নাসারন্ধ্রের পথ দিয়েই দাঁতটি বের করে আনা যায়। এর জন্য বড় করে কাটাছেঁড়া করার প্রয়োজন হয় না।
একটি পর্যালোচনায় এমন ২৭টি ঘটনার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে নাক বা সাইনাসের মধ্যে থাকা এক্টোপিক দাঁত এই পদ্ধতিতে বের করা হয়েছিল। এই ঘটনাগুলিতে অস্ত্রোপচারের আগে সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলি ছিল নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, নাক দিয়ে জল পড়া, মুখে ব্যথা এবং নাক দিয়ে রক্তপাত।
এই ঘটনাটি এতটাই বিরল কেন?
নাক, থুতনি, গালের হাড়ের ভিতরের অংশ (ম্যাক্সিলারি সাইনাস) এবং চোখের কোটরের নীচের অংশে এর আগে এক্টোপিক দাঁতের সন্ধান মিলেছে। কিন্তু ঊর্ধ্ব অরবিটে (চোখের কোটরের উপরের অংশ, অর্থাৎ চোখের পাতা ও ভ্রুর মাঝের অংশ) দাঁত থাকার ঘটনা বিশ্বে এই প্রথম। এই বিষয়ে চিকিৎসক ডঃ তনওয়ার জানিয়েছেন, “আমাদের জানা মতে, ঊর্ধ্ব অরবিটে রিপোর্ট করা এটিই প্রথম এবং একমাত্র এক্টোপিক দাঁতের ঘটনা। এটি শুধু আমাদের জন্য নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই প্রথম ঘটনা। আমরা অত্যন্ত বিস্মিত হয়েছিলাম।”
সাধারণত, বিকাশের সময় কোনও অস্বাভাবিকতা, জিনগত কারণ, সংক্রমণ বা আঘাতের ফলে এক্টোপিক দাঁত গজাতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে ঠিক কী কারণে এমনটা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। ইমেজিং পরীক্ষায় অন্য কোনও এক্টোপিক দাঁতের সন্ধান পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকদের মতে, ওই কিশোরের ক্ষেত্রে পুনরায় এমন দাঁত গজানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
(Feed Source: news18.com)
