হঠাৎই ঝুলে গেল মুখের একদিক, স্ট্রোক হল ২ বছরের শিশুর, নেপথ্যে চিকেন পক্স, বলছেন চিকিৎসকরা

হঠাৎই ঝুলে গেল মুখের একদিক, স্ট্রোক হল ২ বছরের শিশুর, নেপথ্যে চিকেন পক্স, বলছেন চিকিৎসকরা

নয়াদিল্লি: একরত্তি ছেলে সর্দি-কাশিতে ভুগতে পারে। খেলতে গিয়ে চোটও পেতে পারে। কিন্তু কোলের শিশুর স্ট্রোক হতে পারে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তরুণী। কিন্তু সেই অকল্পনীয় বাস্তবেরই মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। মাত্র দু’বছরে ছেলেকে নিয়ে যমে-মানুষে টানাটানি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত যদিও ছেলেকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন তিনি। কিন্তু সেই দিনগুলির কথা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয় তাঁর। তাই অন্য মায়েদের জন্য সচেতনতা তৈরি করতে নেমেছেন তিনি। জানিয়েছেন, কিছু জিনিস জানা থাকলে, তাঁর ছেলের এমন অবস্থা হতোই না। (Childhood Stroke)

ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের বাসিন্দা এলিস বেইলি। তাঁর বয়স ৩৪ বছর। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার খবর সামনে আসে। সেই থেকে অন্যদের মধ্য়ে সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন এলিস। Dailmail-কে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর বড় ছেলে হান্টারের চিকেনপক্স হয়েছিল। আর তা থেকে সংক্রমিত হয়ে পড়ে ছোট ছেলে কার্টারও। গোটা শরীর ভরে যায় লাল গুটিতে। দু’সপ্তাহের মধ্যে সেরেও ওঠে কার্টার। কিন্তু তার পর যা ঘটে, তার জন্য তিনি বা তাঁর স্বামী লরেন্স প্রস্তুত ছিলেন না। (Varicella Zoster Virus of Chickenpox)

এলিস জানিয়েছেন, মাস ছয়েক পরের ঘটনা। এক বিকেলে ছেলেকে স্নান করাতে গিয়ে পরিস্থিতি অস্বাভাবিক ঠেকে তাঁর। দেখেন, ছেলের মুখের ডানদিকের অংশ কিছুটা ঝুলে গিয়েছে। স্ট্রোক হলে এমন হতে পারে বলে জানা ছিল তাঁর। কিন্তু তাঁর দু’বছরের ছেলের স্ট্রোক হতে পারে বলে কল্পনাও করতে পারেননি। সঙ্গে সঙ্গে আপদকালীন পরিষেবার ১১১ নম্বরে ফোন করেন তাঁরা। কিন্তু ফোনে সমস্যা বোঝাতে গিয়েও ধাক্কা খেতে হয়। দু’বছরের ছেলের স্ট্রোক হয়েছে বলে ফোনের অপর প্রান্তের লোকজনও বিশ্বাস করছিলেন না। 

এর কিছু ক্ষণ পরই তাঁদের বাড়িতে ছুটে আসেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। ছোট্ট কার্টারকে ওই অবস্থায় দেখে তাঁরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। নির্দেশিকা অনুযায়ী, স্ট্রোক হলে এক ঘণ্টার মধ্যে রোগীর মস্তিষ্ক স্ক্যান করা জরুরি। কিন্তু কার্টারের রোগ নির্ধারণ করতেই প্রায় দু’ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। তার পর যে খবর পান, তাতে আরও ধাক্কা খান এলিস এবং লরেন্স। চিকিৎসকরা জানান, ছোট্ট কার্টারের মিডল সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়েছে। রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কের বৃহত্তম আর্টারিকে ব্লক করে দিয়েছে, ফলে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

এলিস জানিয়েছেন, যে ছেলে সারাদিন দাপিয়ে বেড়াত, সেই কার্টার হাঁটাচলায় অক্ষম হয়ে পড়ে। উঠে বসতে পারত না, খাবার গিলতে পারত না, কথা বলতেও পারত না। ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখা দুঃসহ হয়ে ওঠে তাঁদের জন্য। ছোট্ট ছেলেকে হাসপাতালের শয্যায় বন্দি হয়ে থাকতে দেখে, যন্ত্রপাতির সাহায্য়ে তার শ্বাস চলছে দেখে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন তাঁরা। ওষুধের সাহায্য়ে প্রায় এক সপ্তাহ কোমায় রাখা হয় কার্টারকে, যাতে মস্তিষ্কের স্ফীতভাব কমে। মাথার কিছু অংশ বাদ দিতে হতে পারে বলেও তাঁদের আগেভাগে জানিয়ে রেখেছিলেন চিকিৎসকরা। কিন্তু তত দূর গড়ায়নি পরিস্থিতি। আরও দু’মাসের বেশি সময় সাউথহ্যাম্পটন হাসপাতালে থাকার পর ধীরে হলেও, কার্টার স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

কিন্তু ছোট্ট ছেলের এমন ভয়ঙ্কর অবস্থা হল কেন? চিকিৎসকরা জানান, চিকেনপক্সের Varicella-zoster ভাইরাস থেকে এমনটা হয়ে থাকতে পারে। চিকেনপক্সকে ছোটবেলার অসুখ, তেমন গুরুতর নয় বলে হেলাফেলা করা হলেও, তা যে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতে পারে, কার্টারই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১০০০ চিকেনপক্স সংক্রমণের মধ্যে এক বা দুই ক্ষেত্রে ভাইরাস মস্তিষ্ক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, এনসেফালাইটিস হতে পারে, স্ফীত হয়ে উঠতে পারে মস্তিষ্ক। কার্টারের ক্ষেত্রে Varicella-zoster ভাইরাস সরাসরি রক্তনালীকে আক্রমণ করেছে। গায়ের গুটি মিলিয়ে গেলেও, ভাইরাস শরীর থেকে বেরিয়ে যায়নি তখনও। স্নায়ুতন্ত্রে আশ্রয় নেয় এবং ধীর গতিতে ধমনীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা Post-Varicella Arteriopathy নামেও পরিচিত। এতে রক্তনালীর দেওয়ালগুলি ফুলতে শুরু করে, ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হয়ে ওঠে।

শিশুদের স্ট্রোক বিরল হলেও, কার্টারই প্রথম নয়। তাই চিকেনপক্সের টিকাকরণের উপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এমনিতে ব্রিটেনে চিকেনপক্সের টিকার দাম প্রায় ১৫০ পাউন্ড। তবে সরকারের তরফে বিনামূল্যে টিকাকরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, সার্বিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক হেলেন বেডফোর্ড বলেন, “টিকাকরণ হয়ে থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে ঝুঁকি তেমন থাকে না। চিকেনপক্স কিন্তু অত্যন্ত জটিল একটি ভাইরাস। শরীরের মধ্যে সুপ্ত থেকে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।” Stroke Association-এর CEo জুলিয়েট বুভেরি জানিয়েছেন, প্রতি বছর ব্রিটেনের প্রায় ৪০০ শিশুর স্ট্রোক হয়, যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশুর মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, যা সারাজীবন থেকে যায়। কারও কথা জড়িয়ে যায়, কারও আবার দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। শিশুদের মধ্যে স্ট্রোকের অন্যতম কারণ হল চিকেনপক্স। সংক্রমণের ছ’মাস পরও স্ট্রোক হতে পারে। 

কার্টারের বয়স এখন চার বছর। হাসপাতাল থেকে ফিরলেও, তার মধ্যে কিছু শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এলিস জানিয়েছেন, শিশুর স্ট্রোক হতে পারে, তা ভাবাই যায় না। চিকেনপক্স না হলে কার্টারেরও স্ট্রোক হতো না বলে মত তাঁর। কার্টারের জীবন যে অন্যখাতে বইতে শুরু করেছে, তা মেনে নিয়েছেন তিনি। প্রত্যেক মায়ের কাছে তাঁর আবেদন, “ভয়ঙ্কর এই ভাইরাসকে রুখতে ছেলেমেয়ের টিকাকরণ সম্পূর্ণ করুন। ওদের জীবন বাঁচবে। ঝুঁকি নেবেন না।”

তথ্যসূত্র: ডেইলিমেল। (https://tinyurl.com/5n67yb4c)

(Feed Source: abplive.com)