কোনও রাষ্ট্রনেতাকে কি বন্দি করা যায়? ভেনিজুয়েলা চালাতে পারেন কি ট্রাম্প? আইন যা বলছে…

কোনও রাষ্ট্রনেতাকে কি বন্দি করা যায়? ভেনিজুয়েলা চালাতে পারেন কি ট্রাম্প? আইন যা বলছে…
নয়াদিল্লি: রাতবিরেতে রুদ্ধশ্বাস অভিযান ভেনিজুয়েলায়। সস্ত্রীক বন্দি করা হয়েছে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। দেশের শাসনকার্য এবং খনিজ সম্পদের উপরও নিজেদের কর্তৃত্ব ঘোষণা করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কাটাছেঁড়া চলছে গতকাল থেকেই। তবে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি করে উঠে আসছে, তা হল, অন্য দেশের রাষ্ট্রনেতাকে বন্দি করাই হোক বা অন্য দেশের উপর নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন, আমেরিকার এই পদক্ষেপ কি আইন স্বীকৃত? (US Attacks Venezuela)

আমেরিকার দাবি, মাদুরোকে আটক করতে সামরিক সহযোগিতা প্রার্থনা করেছিল দেশের বিচারবিভাগ। নিউ ইয়র্কের বিচার বিভাগে আগেই মাদুরো, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের চার্জ গঠন করা হয়েছিল। চার্জ গঠন করা হয়েছিল ভেনিজুয়েলার দুই রাজনীতিক এবং একটি আন্তর্জাতিক গ্যাংয়ের নেতার বিরুদ্ধেও। তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, মাদক ও বেআইনি অস্ত্র মজুত রাখার মামলা ছিল। আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি জানান, আমেরিকার মাটিতে, আমেরিকার বিচার বিভাগই মাদুরোদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। (US Capture Nicolas Maduro)

আমেরিকার কী দাবি?

কিন্তু সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘তৈল স্বার্থ’ চুরির অভিযোগ তোলেন। ভেনিজুয়েলার তেলের উপর আমেরিকার কর্তৃত্ব ঘোষণা করেন যেমন, সেই সঙ্গে জানিয়ে দেন, আপাতত আমেরিকাই ভেনিজুয়েলা চালাবে। ওয়াশিংটনে নিজের মন্ত্রিসভা থেকে কয়েকজনকে ভেনিজুয়েলার দায়িত্বে পাঠাতে পারে বলে খবর। তবে বিশদ তথ্য এখনও খোলসা করেননি ট্রাম্প। কিন্তু আমেরিকা অন্য একটি দেশ কী করে চালাতে পারে? অন্য দেশের সম্পদের উপর কী করে কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন…

আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে যাঁরা ওয়াকিবহাল, তাঁদের মতে, ট্রাম্প সরকার আন্তর্জাতিক আইন সংক্রান্ত বিষয়গুলি উপেক্ষা করছে। ভেনিজুয়েলায় আইন কার্যকর করার কথা বলা হচ্ছে যেমন, পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের মনোভাবও প্রকাশ করা হয়েছে, যা গোটা বিষয়টি জটিল করে তুলছে। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ তথা নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জেরেমি পল বলেন, “একদিকে আইন কার্যকর করার কথা বলে, অন্য দিকে দেশটিকে চালানোর কথা বলা যায় না। গোটা বিষয়টিই যুক্তিহীন হয়ে উঠছে।”

আমেরিকার আইন অনুযায়ীও, যুদ্ধঘোষণার অধিকার কংগ্রেসেরই। তবে প্রেসিডেন্ট হলেন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। দুই দলের প্রেসিডেন্টরাই এযাবৎ সীমিত পরিসরের মধ্যে, জাতীয় স্বার্থে সামরিক অভিযানের সাপেক্ষে যুক্তি প্রমাণ করেছেন। 

মার্কিন কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা থাকলেও রাষ্ট্রপতিই সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।  তবে গত বছর একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের চিফ অফ স্টাফ সুজ়ি উইলস জানান, ভেনিজুয়েলায় যদি ট্রাম্প কোনও পদক্ষেপ করেন, সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের অনুমোদন জরুরি। কিন্তু ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে আগেভাগে যে কংগ্রেসকে বিষয়টি জানানো হয়নি, তা আগেই মেনে নিয়েছেন ট্রাম্পের বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও।

আন্তর্জাতিক বিধিনিয়ম…

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ীও, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ একেবারে নিষিদ্ধ। কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে যদিও, তবে তাতেও রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে, অথবা আত্মরক্ষার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে যে মাদক কারবার এবং হিংসার অভিযোগ তুলছেন ট্রাম্প, তা অপরাধ বলে গণ্য হলেও, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সশস্ত্র সংঘাতের যুক্তি খাটে না এক্ষেত্রে। ফলে সামরিক পদক্ষেপের প্রশ্নও আসে না। 

তাই কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের অধ্যাপক ম্যাথু ওয়্যাস্কম্যান বলেন, “সামরিক বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে, অন্য দেশের সরকার ফেলার ক্ষেত্রে অপরাধ মামলা যুক্তিযুক্ত কারণ নয়। এক্ষেত্রে আত্মরক্ষার তত্ত্ব খাড়া করা হতে পারে।” ২০১৯ সালের পর থেকে ভেনিজুয়েলায় মাদুরোর শাসনকালকে আইনি স্বীকৃতি দেয়নি আমেরিকা। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ সামনে আসায় মাদুরোকে আমেরিকা ভেনিজুয়েলার বৈধ শাসক বলেই মানত না।

এর আগে, লিবিয়ার মতো একাধিক দেশের সন্দেহভাজন অপরাধীদের বন্দি করেছে আমেরিকা। কিন্তু প্রতিবারই স্থানীয় সরকারের অনুমোদন নিতে হয়েছিল। আমেরিকা মাদুরোকে ভেনিজুয়েলার নেতা বলে না মানলেও, তাঁকে বন্দি করার জন্য অন্য কোনও নেতার অনুমোদনও গ্রহণ করেনি তারা। ১৯৮৯ সালে যখন পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেফতার করে আমেরিকা, সেই সময়ও ওয়াশিংটনে মাদক মামলায় চার্জ গঠন করা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। সেবার আমেরিকা জানিয়েছিল, আমেরিকার নাগরিকদের রক্ষা করতেই ওই পদক্ষেপ করতে হচ্ছে তাদের। কারণ পানামা বাহিনীর হাতে আমেরিকার এক সৈনিকও মারা যান। ম্যানুয়েলকে নেতা বলে না মানলেও, তাঁর কাছে পরাজিত এক নেতাকে সেই সময় স্বীকৃতি দিয়েছিল আমেরিকা। ২০২২ সালে হন্ডুরাসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হারনাদেজ়কে প্রত্যর্পণ করে আমেরিকা। পরবর্তীতে মাদক মামলায় ৪৫ বছর জেল হয় তাঁর। গত ডিসেম্বরেই অরল্যান্ডোর সাজা মকুব করেন ট্রাম্প।

আমেরিকা কি জবাবদিহি করবে?

তবে ভেনিজুয়েলা নিয়ে আমেরিকাকে বিপাকে পড়তে হবে বলে মনে করছেন না অনেকেই। তাঁদের মতে আমেরিকা যদি বেআইনি কাজ করেও থাকে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেই মর্মে ব্যবস্থা নেওয়ার রাস্তা নেই তেমন। ফলে আমেরিকাকে জবাবদিহি করতে নাও হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।  

কিন্তু আমেরিকা চাইলেই কি ভেনিজুয়েলা চালাতে পারে? সেখানকার তৈলসম্পদ দখল করে রাখতে পারে? ভেনিজুয়েলা চালানোর ঘোষণা করলেও, এখনও পর্যন্ত নিজের পরিকল্পনার কথা জানাননি ট্রাম্প। বরং তিনি যা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা হল, মাদুরোর ভাইস ডেলচি রদরিগেজ়কে তিনি বাধ্য করবেন তাঁর কথা অনুযায়ী চলতে। ডেলচি কথা শুনলে সেখানে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজনই নেই বলে জানান ট্রাম্প। পেশায় অধ্যাপক তথা স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন সিনিয়র আইনজীবী রেবেকা ইংবার বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেআইনি দখলদারি বলেই ঠাহর হচ্ছে। দেশের আইন অনুযায়ীও প্রেসিডেন্টের এমন পদক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই। ওঁর মাথায় কী চলছে জানি না। কংগ্রেসের কাছ থেকে তহবিলের প্রয়োজনও পড়বে।”

মাদুরোকে বন্দি করার সিদ্ধান্ত কি বৈধ?

মাদুরোকে বন্দি করে আনা কি বৈধ? যেভাবে ভেনিজুয়েলায় ঢুকে তাঁকে বন্দি করা হয় এবং দেশ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়, তাও রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের পরিপন্থী, যে চুক্তিতে অনুমোদন ছিল আমেরিকারও। কারণ রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া, আত্মরক্ষা ব্যতীত, নিরাপত্তা পরিষদের সায়  ছাড়া এক দেশ অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানতে পারে না। বিদেশের মাটিতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা চালানো নিয়ে এর আগে একাধিক বার রাষ্ট্রপুঞ্জের অনুমতি আদায় করে আমেরিকা। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের অনুমোদনও নেওয়া হয়। পাশাপাশি, অত্মরক্ষার প্রশ্নও জড়িয়ে ছিল। কিন্তু কাউকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা, কোনও ভাবেই আত্মরক্ষার আওতায় পড়ে না।

১৯৮৯ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের অধিকাংশ সদস্যই পানামা আক্রমণের নিন্দা করে। আমেরিকা যদিও তাতে ভেটো প্রদান করে। শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটির ফল ছিল ৭৫:২০। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যই আক্রমণের নিন্দা করে। মেনে নেয়, আন্তর্জাতিক আইন, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘিত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপুঞ্জের বিধিনিয়ম আমেরিকার উপর কার্যকর হবে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে জটিল। সংবিধান অনুমোদিত চুক্তিগুলে আমেরিকায় ‘সর্বোচ্চ আইন’ হিসেবে গণ্য হয়। সই আইন যাতে কার্যকর থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে প্রেসিডেন্টদের। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অন্য দেশের উপর বলপ্রয়োগের পরিস্থিতি তৈরি হলে, আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেয় ওই সংবিধানই। যে কারণে পানামাপর্বের সময় আমেরিকার বিচার বিভাগের দফতর জানিয়েছিল, আমেরিকায় দায়ের হওয়া অপরাধ মামলা থেকে পালিয়ে বেড়ানো অপরাধীর নাগাল পেতে বিদেশি FBI মোতায়েনের ক্ষমতা রয়েছে প্রেসিডেন্ট বুশের। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হলেও, দেশের স্বার্থে তা করতে পারেন তিনি। 

ভেনিজুয়েলায় যে বোমাবর্ষণ করেছে আমেরিকা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।  সেখানে ভেনিজুয়েলার বায়ুসেনাঘাঁটি ধ্বংস করে দেওোয়া হয়েছে। পর পর বিস্ফোরণের ছবি ও ভিডিও ঘুরছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও। এই আচরণ যুদ্ধাপরাধের মধ্যে পড়ে কি না, প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। যদিও রুবিও জানিয়েছেন, গ্রেফতারি আটকানোর চেষ্টা করছিলেন যাঁরা, তাঁদের রুখতেই বিস্ফোরণ ঘটাতে হয়। ফলে অনুচ্ছেদ ২-এর আওতায় প্রেসিডেন্ট-কে যে ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে, তাতে আমেরিকার সৈনিকদের রক্ষা করতে হামলার অধিকার রয়েছে।

রাষ্ট্রনেতা হিসেবে কোনও রক্ষাকবচ কি পাবেন মাদুরো?  আন্তর্জাতিক আইন বলছে, বিদেশের আদালতে রাষ্ট্রনেতাদের রক্ষাকবচ প্রাপ্য। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টও সেই সীমাবদ্ধতাকে স্বীকৃতি দেয় ১৮১২ সালে। বলা হয়, কোনও সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রনেতাকে, বিদেশি ভূখণ্ড থেকে গ্রেফতারি বা আটক হওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। মাদুরো সেই রক্ষাকবচ পাবেন কি না, তা দেখার। কারণ ট্রাম্প এবং রুবিও বার বার জানিয়েছেন, মাদুরোকে ভেনিজুয়েলার ‘বৈধ শাসক’ বলেই স্বীকৃতি দেয়নি আমেরিকা।

(Feed Source: abplive.com)