
ভারতের জন্য খুলে যাবে প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ইউরোর বিশাল বাজার
দীর্ঘ দেড় যুগের অপেক্ষার অবসান কি আসন্ন ? ২০০৭ সাল থেকে ঝুলে থাকা ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ (FTA) নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যখন সংরক্ষণবাদ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে, তখন ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন একে অপরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এই চুক্তি সফল হলে ভারতের জন্য ইউরোপের ২৭টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ইউরোর বিশাল বাজারের দরজা খুলে যাবে।
ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে কোন কোন বিষয়
তবে এই বিশাল সুযোগের সঙ্গে রয়েছে বেশ কিছু জটিল শর্ত বা ‘ফাইন প্রিন্ট’, যা ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কৌশলগত গুরুত্ব ও বাণিজ্যের খতিয়ান গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (GTRI)-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, গত চার বছরে এটি হতে চলেছে ভারতের নবম বাণিজ্য চুক্তি। ২০২৫ অর্থবর্ষে ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে পণ্য বাণিজ্য ১৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। চিন-নির্ভরতা কমাতে এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলকে বহুমুখী করতে ইউরোপের কাছে ভারত এখন এক অপরিহার্য মিত্র। ভারতের ৪.২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যা ইউরোপের জন্য এক বিশাল বাজার।
শুল্ক নিয়ে দড়ি টানাটানি চুক্তির আলোচনায় দুই পক্ষই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় অনড়
ইউরোপের দাবি: ইইউ চাইছে তাদের ৯৫ শতাংশ পণ্যের ওপর থেকে ভারত শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নিক। বিশেষ করে ইউরোপীয় বিলাসবহুল গাড়ি ও মদের (Wine and Whiskey) ওপর শুল্ক কমানোর জন্য তারা প্রবল চাপ দিচ্ছে। বর্তমানে ভারতে আমদানিকৃত মদের ওপর ১৫০% শুল্ক রয়েছে, যা তারা ১০-২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে চায়। একইভাবে, গাড়ির ওপর ১০০-১২৫% শুল্ক কমিয়ে ১০-২০% করার প্রস্তাব রয়েছে।
ভারতের অবস্থান: ভারত কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যকে (যেমন চিজ বা স্কিমড মিল্ক পাউডার) এই আলোচনার বাইরে রেখেছে। অর্থাৎ, কৃষকদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে এমন কওনো শর্ত ভারত মানবে না। ভারত প্রায় ৯০ শতাংশ পণ্যে শুল্ক কমাতে রাজি বলে জানা গেছে।
ভারতের লাভ কোথায় ? এই চুক্তি হলে ভারতের তৈরি পোশাক (Textile), চামড়াজাত পণ্য এবং অটো পার্টস শিল্প সবথেকে বেশি লাভবান হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বা ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত (Zero-duty) সুবিধা পায়, সেখানে ভারতীয় পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রায় ১০% শুল্ক দিতে হয়।
অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিল (AEPC)-এর চেয়ারম্যান এ. শক্তিভেলের মতে, এই চুক্তি ভারতের পোশাক শিল্পের জন্য এক বিশাল সুযোগ, যা প্রতিযোগিতার বাজারে ভারতকে সমানে টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা দেবে।
জিএসপি (GSP) ও ইস্পাত শিল্প নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের কিছু পণ্যের ওপর থেকে জেনারেলাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স (GSP) বা বিশেষ শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করেছে। এতে ৮৭ শতাংশ রপ্তানি পণ্য প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে রপ্তানিকারকদের সংগঠন FIEO জানিয়েছে, অনেক পণ্যে এমনিতেই শুল্ক শূন্য থাকায় এর প্রভাব খুব একটা মারাত্মক হবে না।
অন্যদিকে, ভারতীয় ইস্পাত শিল্পের জন্য ইউরোপের কোটা ব্যবস্থা এবং শুল্ক নীতি (Safeguard duties) একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিল (EEPC) ইউরোপের এই কোটা বাড়ানোর প্রস্তাবকে শিল্পের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছে।
পরিষেবা খাত ও ভিসা সমস্যা ভারত চাইছে তাদের আইটি (IT) এবং দক্ষ পেশাদারদের জন্য ইউরোপের ভিসা নিয়ম সহজ করা হোক। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘ডেটা সিকিউরিটি’ বা তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে ভারতের ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করতে চাইছে। এছাড়া ভারতীয় কোম্পানিগুলোকে ইউরোপে অফিস খোলার বাধ্যবাধকতা এবং উচ্চ বেতনের শর্তগুলো ডিজিটাল বাণিজ্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ঐতিহাসিক চুক্তির অপেক্ষায়
সব মিলিয়ে ভারত ও ইইউ এফটিএ (FTA) উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হতে পারে। ভারত ইউরোপে স্মার্টফোন, পোশাক, ওষুধ এবং পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করে, যা ইউরোপের নিজস্ব উৎপাদনের প্রতিযোগী নয় বরং পরিপূরক। এখন দেখার বিষয়, শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধার (Non-tariff barriers) কাঁটা সরিয়ে দুই পক্ষ কত দ্রুত এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারে।
(Feed Source: abplive.com)
