Mother of all Trade Deals: ধ্বংসের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ইউরোপ, যুদ্ধের টাকা জোগাড়েই এই বাণিজ্য চুক্তি! ভারতের সঙ্গে ডিল সই হতেই তেলেবেগুনে ট্রাম্প…

Mother of all Trade Deals: ধ্বংসের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে ইউরোপ, যুদ্ধের টাকা জোগাড়েই এই বাণিজ্য চুক্তি! ভারতের সঙ্গে ডিল সই হতেই তেলেবেগুনে ট্রাম্প…

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ইউরোপ নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিজেই অর্থায়ন করছে, ভারত-ইইউ বাণিজ্য (India-EU Trade Deal) চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প শিবিরের কড়া হুঁশিয়ারি।

ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) যখন চূড়ান্ত রূপ পেতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন অর্থাত্‍ ট্রাম্পের কাছ থেকে এল এক নজিরবিহীন ও কড়া হুঁশিয়ারি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (US President Donald Trump) প্রশাসন এই চুক্তিকে ইউরোপের জন্য একটি ‘আত্মঘাতী পদক্ষেপ’ (Suicidal Step) হিসেবে বর্ণনা করেছে। ট্রাম্প শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ কার্যত নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরই অর্থায়ন করছে।

দেখতে গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনীতির ইতিহাসে এক অভাবনীয় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এখন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া শুল্ক নীতি যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলেছে, ঠিক তখনই দীর্ঘ ১৮ বছরের প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভারত ও ইইউ স্বাক্ষরিত করতে চলেছে ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA)। এই চুক্তিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন ‘মাদার অফ অল ডিলস’ বা সব চুক্তির সেরা চুক্তি বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই মৈত্রীতে চরম ক্ষুব্ধ ওয়াশিংটন।

ইউরোপের জন্য এটি এমন এক সময়, যখন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। গ্রিনল্যান্ড দখলের মার্কিন পরিকল্পনার বিরোধিতা করায় ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ জোরদার করার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। পরে অবশ্য সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন তিনি।

ইউরোপীয় অতিথি নির্বাচনের মাধ্যমে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তাও দিচ্ছে—ভারতের উপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা নতুন বছরেও চলায় দিল্লি বাকি বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দ্রুত জোরদার করছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের আপত্তির মূল কারণ

মার্কিন প্রশাসনের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত এবং ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে ট্যারিফ বা শুল্ক যুদ্ধের মুখোমুখি, তখন ভারতের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির সাথে এই বিশাল চুক্তি করা ইউরোপের কৌশলগত ভুল। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা মনে করছেন, ভারত-ইউরোপ এই “মাদার অফ অল ডিল” বা সব চুক্তির সেরা চুক্তিটি আসলে মার্কিন অর্থনৈতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি মাধ্যম।

ওয়াশিংটনের দাবি, ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের প্রযুক্তি এবং বাজার ভারতের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে নিজেদের উৎপাদন শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ট্রাম্প শিবিরের কর্মকর্তাদের ভাষায়, “ইউরোপ এমন একটি ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করছে যা ভবিষ্যতে তাদের নিজস্ব অর্থনীতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।”

আমেরিকার হুঁশিয়ারি: ‘নিজেদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ’

ভারতীয় পণ্যের ওপর আমেরিকার ৫০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় ফাটল ধরিয়েছে। দফায় দফায় আলোচনার পরেও ট্রাম্প প্রশাসন নমনীয় না হওয়ায় ভারত বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকেছে। ভারতের এই ইইউ-মুখী পদক্ষেপে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মার্কিন অর্থ সচিব স্কট বেসেন্ট ইউরোপীয় নেতাদের সতর্ক করে বলেছেন, “আপনারা বুঝতে পারছেন না, কী ভাবে নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থ জোগাচ্ছেন।”

ভারত-ইইউ চুক্তির গুরুত্ব

ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে এই চুক্তিটি গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ঘটনা। এর লক্ষ্য হলো দুই অঞ্চলের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবার আদান-প্রদান সহজতর করা, শুল্ক কমানো এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কর্মীদের যাতায়াতের (Mobility) ক্ষেত্রে এই চুক্তি ঐতিহাসিক মোড় ঘোরাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে আলোচনার পর এই চুক্তির সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো, বিশেষ করে জার্মানি এবং ফ্রান্স মনে করে যে, ট্রাম্পের কঠোর শুল্ক নীতি এবং গ্রিনল্যান্ড কেনা বা ন্যাটোর নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তার এই সময়ে ভারতের মতো বড় বাজারের সাথে জোট বাঁধা অত্যন্ত জরুরি।

১৮ বছরের দীর্ঘ পথচলা ও চুক্তির গুরুত্ব

২০০৭ সালে শুরু হওয়া এই বাণিজ্য আলোচনা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ২০২৬-এর জানুয়ারিতে চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে। প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হিসেবে উরসুলা ফন ডার লায়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তার উপস্থিতিতে এই চুক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

শুল্ক যুদ্ধ ও গ্রিনল্যান্ড বিতর্ক

ট্রাম্প প্রশাসনের এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এলো যখন ইউরোপ এবং আমেরিকার সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড কেনা নিয়ে ট্রাম্পের একরোখা অবস্থানের কারণে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি পূর্বনির্ধারিত বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করেছে।

এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প শিবিরের ধারণা, ইউরোপ ভারতের সাথে সখ্যতা বাড়িয়ে আসলে যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করতে চাইছে। তাদের মতে, ভারত-ইউরোপীয় সংহতি বিশ্ববাণিজ্যে ডলারের প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টাকেও ত্বরান্বিত করতে পারে।

ভারতের অবস্থান: মাথা নত না করার প্রত্যয়

ভারত এই বিতর্কে অত্যন্ত কৌশলী ও দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, ভারতের জাতীয় স্বার্থ কোনো নির্দিষ্ট দেশের নির্দেশে পরিচালিত হবে না। প্রজাতন্ত্র দিবস ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে ভারতীয় কূটনৈতিক মহলে এই সুরই ধ্বনিত হয়েছে যে—ভারত চাপের মুখে মাথা নত করবে না।

প্রখ্যাত শিল্পপতি সুনীল ভারতী মিত্তাল সম্প্রতি দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বলেছেন, ট্রাম্পের নীতি ইউরোপকে এক গভীর ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছে। ইউরোপ এখন বুঝতে পারছে যে তাদের একটি একক কণ্ঠস্বর থাকা প্রয়োজন এবং ভারতের সাথে এই বাণিজ্য চুক্তি সেই আত্মনির্ভরশীলতারই বহিঃপ্রকাশ।

এ চুক্তি উভয় পক্ষের জন্য কী নিয়ে আসছে?

ট্রাম্প শিবিরের এই “যুদ্ধ অর্থায়ন” সংক্রান্ত মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা চায় না যে ইউরোপ বা ভারত—কেউই স্বাধীনভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের নেতৃত্ব দিক। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভারতের সাথে এই চুক্তি সম্পন্ন করার মাধ্যমে একটি বার্তা দিতে চায় যে, তারা এখন আর ওয়াশিংটনের ডিক্টেশনের ওপর নির্ভরশীল নয়।

এই চুক্তির ফলে ২ বিলিয়ন মানুষের একটি সুবিশাল মুক্ত বাজার তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ভারতের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ:

১. মার্কিন শুল্কের ধাক্কা সামলানো: আমেরিকার শুল্ক বৃদ্ধির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ভারতীয় ওষুধ, ইস্পাত ও বস্ত্র শিল্পের জন্য ইউরোপ একটি বিশাল নিরাপদ বাজার হয়ে উঠবে।

২. জিএসপি (GSP) সুবিধা: ২০২৩ সালে প্রত্যাহার করা শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা এই চুক্তির মাধ্যমে ফিরে পেতে পারে ভারত।

৩. কৌশলগত বার্তা: চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এই বার্তার মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে বুঝিয়ে দিল যে তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল নয়।

কাঁটা যেখানে: কার্বন কর ও মেধাস্বত্ব

চুক্তি চূড়ান্ত হলেও কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে। ইউরোপের ‘কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম’ (CBAM) বা কার্বন কর নিয়ে ভারতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মহলে উদ্বেগ রয়েছে। এছাড়া মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং পেটেন্ট নীতি নিয়েও ব্রাসেলসের কঠোর অবস্থান দিল্লির জন্য চ্যালেঞ্জিং। তবে ভারত কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোকে আপাতত এই চুক্তির বাইরে রেখে ধাপে ধাপে এগোতে চাইছে।

নতুন মেরুকরণ: কানাডা ও অন্যান্য শক্তি

শুধু ইউরোপ নয়, ক্যানাডাও এখন ভারতকে শক্তিশালী অংশীদার হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প ক্যানাডার পণ্যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোয় ওটাওয়া এখন দিল্লির সাথে ইউরেনিয়াম, খনিজ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বড় চুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী মার্চে ক্যানাডার প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এই নতুন মেরুকরণকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

সামনের মাসগুলোতে এই বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে। একদিকে আমেরিকার সংরক্ষণবাদ, আর অন্যদিকে ভারত-ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য নীতি—এই দুইয়ের লড়াই এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

(Feed Source: zeenews.com)