জি ২৪ ঘন্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ক্রিকেট ও রাজনীতির বেশ ভালো ভাবেই ব্যালেন্স করে চলছিলেন মনোজ তিওয়ারি (Manoj Tiwary)। একুশে বিধানসভা ভোটে হাওড়ার শিবপুর কেন্দ্রে তৃণমূল (TMC) প্রার্থী ছিলেন বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক ও বঙ্গজ ক্রিকেটের সর্বকালের সর্বাধিক রানশিকারি (১০ হাজার ১৯৫)। সেবার বিজেপির (BJP-র) হেভিওয়েট প্রার্থী রথীন চক্রবর্তীকে তিরিশ হাজারের উপর ভোটে হারিয়েই বিধায়ক হন তিনি। এরপর মনোজকে ক্রীড়া ও যুবকল্য়াণের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।
ছাব্বিশের নির্বাচনে টিকিটই পাননি মনোজ। তাঁর বদলে টিএমসি এবার শিবপুরে তৃণমূল প্রার্থী করেছিল রানা চট্টোপাধ্যায়কে। যদিও ঘাসফুলের সেই শক্ত ঘাঁটিতেই ফুল ফুটিয়েছেন বিজেপি-র রুদ্রনীল ঘোষ (Rudranil Ghosh)। ১৬ হাজারের উপর ভোটেই জিতেই বিধানসভায় যাবেন অভিনেতা-রাজনীতিবিদ। ঘটনাচক্রে মনোজ ভোটের টিকিট না পেয়ে জানিয়ে ছিলেন যে, তাঁর খারাপ লেগেছিল। এমনকী বিজেপি-র প্রস্তাবের কথাও জানিয়ে ছিলেন মনোজ। আগামী দিনে প্রাক্তন ক্রিকেটার পদ্ম শিবিরে নাম লেখাবেন কিনা তা সময় বলবে। তবে তৃণমূলকে অতীতের অধ্যায় হিসেবে বলেই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে। মনোজ নিজেই এক্সে সেই সাক্ষাৎকারের লিংক শেয়ার করেছেন ‘পাপ বাপকেও ছা়ড়ে না’ ক্যাপশন দিয়ে। তৃণমূলের দুর্নীতি থেকে শুরু করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসেরও (Arup Biswas) মুখোশ খুলে দিয়েছেন। পাশাপাশি দল ছাড়ার ঘোষণাও করে দিলেন মমতার হাত থেকে দলের পতাকা নেওয়া মনোজ।
২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল প্রথম ক্ষমতায় এসেছিল। ২০১১ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তূণমূল সরকার রাজ্যে ১৫ বছর ক্ষমতায় পূর্ণ করেছে। ২০১৬ ও ২০২১ সালেও বিপুল জয় নিয়ে সরকার গঠন করা টিমএসি অস্তাচলে। অঙ্গ-কলিঙ্গের পর এবার বঙ্গেও বিজেপি পদ্ম ফোটাল। বাংলায় ধেয়ে এসেছে এক অভাবনীয় গেরুয়া ঝড়। এই প্রথমবার বঙ্গের সিংহাসনে ভারতীয় জনতা পার্টি। পদ্ম ফুলের অবিশ্বাস্য ভূমিধস বিজয়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে টিএমসি-র এই পতন হওয়ারই ছিল বলে মনে করেন মনোজ। তিনি বলেছেন, ‘দেখুন, এই বিপর্যয়ে আমি বিন্দুমাত্র অবাক হইনি। যখন গোটা দলই দুর্নীতিতে লিপ্ত এবং কোনও ক্ষেত্রেই কোনও উন্নয়ন নেই, তখন তো এমনটা হওয়ারই ছিল। শুধু তারাই টিকিট কিনতে পেরেছেন, যাঁরা মোটা অঙ্কের টাকা দিতে পেরেছেন। এবার অন্তত ৭০-৭২ জন প্রার্থী টিকিট পাওয়ার জন্য প্রায় ৫ কোটি টাকা দিয়েছেন। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। কিন্তু আমি টাকা দিতে অস্বীকার করি। এটাও দেখুন যে, যাঁরা টাকা দিয়েছে তাঁদের মধ্যে কতজন জিততে পেরেছেন। আর টিএমসি আমার জন্য ক্লোজড চ্যাপটার।’
২০১৯ সালে মনোজের কাছে তৃণমূলের থেকে লোকসভা নির্বাচনের টিকিটের প্রস্তাব ছিল। যদিও তাঁর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কোনও ইচ্ছাই ছিল না। তবে শেষমেশ তিনি মত পরিবর্তন করেন এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শিবপুর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়লাভ করেছিলেন। মনোজ বলেন, ‘সেই সময়ে আমি আইপিএলে পাঞ্জাব কিংসের হয়ে খেলছিলাম এবং রঞ্জি ট্রফিও সিরিয়াসলি খেলছিলাম। ঠিক তখনই দিদি (মমতা) চাইলেন যে, আমি যেন লোকসভা নির্বাচনে লড়ি। আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। কিন্তু ২০২১ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে দিদি আবারও আমাকে ফোন করলেন এবং বললেন, মনোজ, তোমার জন্য আমার একটা মেসেজ আছে, আর সেটা তোমাকে অরূপই পৌঁছে দেবে। আমাকে শিবপুর কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়তে বলা হল আর তখন আমার মনে হল যে—আমি হয়তো সত্যিই কোনও অর্থবহ পরিবর্তন ঘটাতে পারব।’
মনোজের অভিযোগ, তৃণমূলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব রয়েছে। ক্রিকেটারের সংযোজন, ‘আমি এমন অনেক বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম যেখানে তৃণমূলের সব মন্ত্রীকেই তলব করা হত। আমাকে ‘এমওএস’ (প্রতিমন্ত্রী) পদের একটি ললিপপ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার কার্যত কোনও অর্থই ছিল না। আমি যদি উঠে দাঁড়িয়ে বলতাম, দিদি, আমি একটি নির্দিষ্ট সমস্যার প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তিনি মাঝপথেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলতেন, তোমাদের মতো লোকের জন্য আমার কাছে কোনও সময় নেই।’ মনোজ আরও জানিয়েছেন যে, হাওড়ায় নিকাশি ও পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে যে দীর্ঘদিনের সমস্যা রয়েছে, তা নিরসনে তিনি বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও কোনও সুরাহা হয়নি। ‘একজন বর্তমান বিধায়ক হিসেবে আমার নির্বাচনী এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। অথচ যাঁরা বছরের পর বছর ধরে হাওড়া পৌরসভা নিয়ন্ত্রণ করেছে, এবং এই সময়ের মধ্যে কোনও নির্বাচনই হতে দেয়নি, তাঁরা কখনই এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করেননি। তাঁরা উন্নয়নের কাজ অকারণে আটকে দিত। অথচ সেই কাজগুলি ছিল অত্যন্ত মৌলিক ও জরুরি। আমি আপনাদের এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, আমি যেসব কাজ করিয়েছি, তার সবটুকু কেবল বিধায়ক তহবিল থেকেই করা হয়নি, বরং বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য আমাকে নিজের পকেট থেকেও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। প্রতি বছরই দিদি ভূগর্ভস্থ নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য একটি মাস্টার প্ল্যানের কথা ঘোষণা করতেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হত না। সেটা ছিল স্রেফ কথার কথা।’
মনোজের বিরুদ্ধে শিবপুরের বিল্ডারদের থেকে তোলাবাজির অভিযোগও রয়েছে। যদিও তিনি হেসেই এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। মনোজ বলেছেন, ‘আপনাদের জানিয়ে রাখি যে, ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে যখন আমি আমার আয়ের হলফনামা জমা দিয়েছিলাম, তখন আমি ঘোষণা করেছিলাম যে আমার মোট সম্পদের পরিমাণ ২০ কোটি টাকা। আমি ১০ বছর ধরে আইপিএল খেলেছি, ২০ বছর ধরে খেলেছি প্রথম-শ্রেণীর ক্রিকেট এবং বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতীয় দলেরও অংশ ছিলাম। তাই তোলাবাজির টাকার আমার কোনও প্রয়োজন নেই। ৭-৮ জন স্থানীয় কাউন্সিলর ছিলেন, যাঁরা নিয়মিত দিদিকে চিঠি লিখতেন। আমার বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিল।’
মনোজ প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকেও ধুয়ে দিয়েছেন এই সাক্ষাত্কারে। মনোজ বলেছেন যে, অরূপ বিশ্বাস তাঁকে অবজ্ঞা করেছেন। নিজের হীনমন্যতা বা নিরাপত্তাহীনতার কারণেই মনোজকে তাঁর মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করতে দেননি অরূপ। ‘আরে অরূপদা তো খেলার এ-বি-সি-ডি’ই জানেন না। এমন অনেক অনুষ্ঠান হয়েছে যেখানে অরূপদা এবং আমি, দু’জনেই আমন্ত্রিত ছিলাম। অথচ আমাকে মঞ্চে ডাকার প্রয়োজনই মনে করা হত না। একবার ডুরান্ড কাপের ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠানে আমার ছবি স্পোর্টস পেজে ফলাও করে ছাপা হয়েছিল। আর ঠিক তারপরের ডুরান্ড কাপ থেকেই আমি আর কোনও আমন্ত্রণই পাইনি।’ অরূপের প্রসঙ্গেই কলকাতায় মেসি কাণ্ড নিয়েও কথা বলেছেন মনোজ। তিনি বলেন, ‘আমি জানতামই যে, এমন কিছু একটা ঘটতে চলেছে, আর তাই আমি সেই অনুষ্ঠানেই যাইনি। আমি এমন কোনও কর্মসূচির অংশ হতে চাইনি, যেখানে সাধারণ মানুষকে স্রেফ বোকা বানানো হয়। আমি বারবার অরূপদাকে অনুরোধ করতাম—দাদা, বরাদ্দকৃত বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দয়া করে একটি সুনির্দিষ্ট ক্রীড়ানীতি প্রণয়ন করুন। কিন্তু তিনি কখনই এই বিষয়ে কোনও গুরুত্বই দেননি।’
বিসিসিআইয়ের লেভেল টু কোচিং পরীক্ষায় পাস করেছেন মনোজ।বর্তমানে একটি স্পোর্টস ওয়েবসাইটের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। আগামী দিনে বাংলার রঞ্জি দলের হেড কোচ হতে চান। এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল হেড কোচের পদের জন্য আবেদন আহ্বান করেছে। আমি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে বিসিসিআই লেভেল টু পরীক্ষায় পাস করেছি এবং অদূর ভবিষ্যতে কোচিংকেই পেশা হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে চাই।’ প্রাক্তন ক্রিকেটার ও টিএমসি নেতা লক্ষ্মীরতন শুক্লাও প্রাক্তন ক্রীড়া ও যুব কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৬ সালে হাওড়া উত্তর কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যাবিনেটে মন্ত্রী হন। তবে ক্রিকেটে ফোকাস করবেন বলেই ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি মন্ত্রীত্বের পাশাপাশি ও দলীয় পদ থেকেও ইস্তফা দেন। লক্ষ্মীরতনও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি-কে শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্ট করেছেন।
(Feed Source: zeenews.com)
